টেলিগ্রাফ রিপোর্ট | ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্য বাজেটে বেকারদের জন্য বড় চমক দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। জানানো হয়েছে, আগামী ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে চালু হবে ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য।
যাঁরা মাধ্যমিক পাশ করে এখনও চাকরির অপেক্ষায় আছেন, ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে থাকা সেই সমস্ত যুবক-যুবতীরাই এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে একটি সুবিধা নিলে অন্যটি পাওয়া যায় না, কিন্তু ‘বাংলার যুবসাথী’র ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্কলারশিপ পেলেও এই ১৫০০ টাকার ভাতা পাওয়া যাবে।
রাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরেই ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক বেকারদের ভাতা প্রদান করে আসছে। তবে এবারের বাজেটে ঘোষিত ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পটি আরও ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের আওতায় মাধ্যমিক পাশ করা পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুবক-যুবতীরা প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন।
প্রকল্পের মূল শর্তাবলি:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: ন্যূনতম মাধ্যমিক (১০ম শ্রেণি) পাশ হতে হবে।
- বয়সসীমা: আবেদনকারীর বয়স ২১ বছর পূর্ণ হতে হবে। ২১ বছর থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
- ভাতার মেয়াদ: এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত। তবে এই সময়ের মধ্যে যদি কোনো আবেদনকারী স্থায়ী চাকরি পেয়ে যান, তবে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে।
- শুরুর তারিখ: ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট, অর্থাৎ আগামী বছরের স্বাধীনতা দিবস থেকে এই প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি প্রাপকদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছানো শুরু হবে।
বাজেট বরাদ্দ ও সামাজিক সুরক্ষা
রাজ্য সরকার এই বিশাল প্রকল্পের ব্যয়ভার বহনের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। উল্লেখ্য, উচ্চশিক্ষার জন্য যারা সরকারি বা বেসরকারি স্কলারশিপ পাচ্ছেন, তারাও এই ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ, এটি একটি অতিরিক্ত আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করবে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও নারী ক্ষমতায়ন
বাজেটে কেবল বেকার যুবক নয়, মহিলাদের জন্যও খুশির খবর রয়েছে। রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর অর্থের পরিমাণ আরও এক দফা বাড়ানো হয়েছে।
- সাধারণ শ্রেণির মহিলারা আগে যেখানে মাসে ১,০০০ টাকা পেতেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তারা পাবেন ১,৫০০ টাকা।
- তফসিলি জাতি (SC), জনজাতি (ST) এবং পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মহিলাদের মাসিক বরাদ্দ ১,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৭০০ টাকা করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের প্রায় ২ কোটিরও বেশি মহিলা সরাসরি উপকৃত হবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের জোগান বাড়াতে সাহায্য করবে।
ডিএ বৃদ্ধি ও সরকারি কর্মীদের প্রাপ্তি
দীর্ঘদিনের দাবি মেনে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য আরও ৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (DA) ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে কেন্দ্রীয় হারের সঙ্গে রাজ্যের ডিএ-র ব্যবধান কিছুটা হলেও কমবে। এর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের কর্মীদের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:
- আশাকর্মী (ASHA Workers): তাঁদের মাসিক সম্মানি ভাতা ১,০০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
- অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা: তাঁদের ভাতাও ১০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটি বর্তমান সরকারের একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’। একদিকে যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাধ্যমে নারী ভোট ব্যাংককে সুসংহত করার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে ‘বাংলার যুবসাথী’র মাধ্যমে তরুণ ও প্রথমবার ভোটদাতাদের (First-time Voters) মন জয় করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে রাজ্যে ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেকারদের নাম এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত থাকলেও, সবাই ভাতা পেতেন না। কিন্তু ‘বাংলার যুবসাথী’র মাধ্যমে মাধ্যমিক পাশ সকল যোগ্য বেকারকে এই ভাতার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনাটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। ৫,০০০ কোটি টাকার এই বিশাল ব্যয়ের সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিরোধী শিবিরের সমালোচনা থাকলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘোষণাকে ঘিরে ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

