পুরান ঢাকার সরু গলি আর পুরোনো স্থাপনার ভিড়ে লুকিয়ে আছে শতবর্ষী এক স্থাপত্য।
নাম তার শঙ্খনিধি হাউজ। রাজধানীর টিপু সুলতান রোডে অবস্থিত এই ভবনটি শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়; এটি ঢাকার ঐতিহ্য, স্থাপত্যরীতি এবং নগর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হারিয়ে গেলেও শঙ্খনিধি হাউজ এখনও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
বিশ শতকের শুরুর দিকে ঢাকার ব্যবসায়ী লালমোহন সাহা ও গৌর নিতাই সাহা এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, ১৯২১ সালের দিকে নির্মিত এই ভবনটি তখনকার ধনী বণিক সমাজের ঐশ্বর্য ও নান্দনিকতার প্রতীক ছিল। ‘শঙ্খনিধি’ উপাধিটি তারা গ্রহণ করেছিলেন তাদের ব্যবসা ও সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে।
স্থাপত্যের দিক থেকে শঙ্খনিধি হাউজ ছিল এক অনন্য নিদর্শন। ভবনটিতে ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়।
উঁচু বারান্দা, অলংকৃত কলাম, কারুকার্যময় বারান্দার রেলিং এবং প্রশস্ত উঠান — সব মিলিয়ে এটি ছিল পুরান ঢাকার অভিজাত বাড়িগুলোর অন্যতম। একসময় বাড়িটির উঠানে ছিল সাদা মার্বেলের মেঝে, যা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার অবস্থা বদলে গেছে। বর্তমানে ভবনটির একটি বড় অংশে গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ ও বিভিন্ন দোকানপাট গড়ে উঠেছে। স্থাপত্যের অনেক অলংকরণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং ভবনটির মূল সৌন্দর্য অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।
অথচ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কয়েক দশক আগে এটিকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তবুও যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় এই স্থাপত্য ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
শঙ্খনিধি হাউজের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের গল্প। একসময় যে বাড়িটি ছিল সম্ভ্রান্ত পরিবারের আবাস, সেটি আজ নগরায়নের চাপে তার পুরোনো রূপ হারানোর পথে।
তবুও ইতিহাসপ্রেমী ও স্থাপত্য অনুরাগীদের কাছে এটি এখনও আকর্ষণের জায়গা।
যা দেখবেন
শঙ্খনিধি হাউজে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে পুরোনো ইউরোপীয় ধাঁচের বারান্দা ও কলাম। যদিও অনেক অংশ ভেঙে গেছে, তবুও ভবনের নকশায় অতীতের নান্দনিকতা এখনও অনুভব করা যায়।
ভবনের সামনে ও পাশের অংশে পুরোনো ঢাকার পরিবেশ, সরু রাস্তা এবং ঐতিহ্যবাহী ভবনের সমাহারও দেখার মতো। আশেপাশে ঘুরলে পুরান ঢাকার আরও কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনার দেখা মিলতে পারে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে গুলিস্তান বা সদরঘাট এলাকায় যেতে হবে। সেখান থেকে রিকশা বা হেঁটে টিপু সুলতান রোডে পৌঁছানো যায়। পুরান ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার মাঝেই শঙ্খনিধি হাউজের অবস্থান।
কোথায় খাবেন
পুরান ঢাকায় গেলে খাবারের অভিজ্ঞতা ভ্রমণের বড় অংশ। কাছাকাছি এলাকাতেই পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী কাচ্চি বিরিয়ানি, নেহারি, কাবাব ও বাখরখানি। চকবাজার, নাজিরাবাজার বা বংশাল এলাকায় গেলে পুরান ঢাকার বিখ্যাত খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
শঙ্খনিধি হাউজের আশপাশে পর্যটকদের জন্য বড় হোটেল নেই। তবে গুলিস্তান, মতিঝিল বা পুরান ঢাকার কাছাকাছি এলাকায় বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেখানে স্বল্প খরচে থাকা যায়।
উন্নত মানের থাকার জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকা যেমন ধানমন্ডি, শাহবাগ বা বনানীর হোটেলগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে। শঙ্খনিধি হাউজ আজ শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি ঢাকার অতীতের এক জীবন্ত দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এই স্থাপনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নগর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকতে পারে।

