ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার ধারণা একসময় বিশ্বজুড়ে হাস্যরসের জন্ম দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই ধারণার নেপথ্যে যিনি ছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ধনকুবের রোনাল্ড এস. লডার। বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী সাম্রাজ্য ‘এস্টি লডার কোম্পানিজ’-এর উত্তরাধিকারী এই ব্যবসায়ী শুধু কর্পোরেট জগতেই নয়, রাজনীতি ও কূটনীতিতেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশ্যে আসে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবের গল্প। বোল্টনের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প একদিন তাকে জানান, এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে গ্রিনল্যান্ড কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই বন্ধু ছিলেন রোনাল্ড লডার।
বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। এমনকি, এটি কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
রোনাল্ড লডার মূলত এস্টি লডার এবং জোসেফ লডারের পুত্র। ১৯৪৬ সালে এস্টি লডার কোম্পানিজ নামে বৈশ্বিক প্রসাধনী শিল্পের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলে লডার পরিবার। পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই অবস্থানকে লডার কেবল ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। লডারের শিক্ষাজীবনও তার বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্স থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ওয়ারটন স্কুলে ব্যবসায় শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে প্যারিস ও ব্রাসেলসে উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় সার্টিফিকেট অর্জন করেন।
মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি পারিবারিক কোম্পানিতে যোগ দেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে লডারের আগ্রহ কেবল তাত্ত্বিক ছিল না। তিনি নিজেকে ‘গ্রিনল্যান্ড বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন, দ্বীপটির ভূগর্ভে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত বিরল খনিজের বিশাল ভাণ্ডার।
তার মতে, গ্রিনল্যান্ড ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক পরাশক্তিদের কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।
রাজনীতিতে লডার দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকান পার্টির একজন বড় দাতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছেন। ২০১৬ সাল থেকে ট্রাম্পপন্থী সংগঠনগুলোতে তিনি মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন।
ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ‘অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন লডার। একই সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী অবস্থান ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বহুল আলোচিত।
কূটনৈতিক অঙ্গনেও লডারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। রোনাল্ড রিগানের আমলে তিনি ইউরোপীয় ও ন্যাটো বিষয়ক উপ-সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন এবং পরে অস্ট্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে সিরিয়ার সঙ্গে গোপন শান্তি আলোচনায় তিনি বিশেষ দূত হিসেবেও কাজ করেন।
ব্যবসা, রাজনীতি, কূটনীতি ও জনহিতকর কর্মকাণ্ডসহ মার্কিন সমাজে রোনাল্ড লডার একটি বহুমাত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার দেওয়া একটি প্রস্তাব আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। সেই প্রস্তাব ইতিহাসের কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: এল পাইস
#আরএ

