ইসলামী আকিদা অনুযায়ী মহাপ্রলয় তথা কিয়ামতের পূর্বলক্ষণসমূহের মধ্যে দাজ্জালের আবির্ভাব একটি অন্যতম বড় ফেতনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দাজ্জালের ফেতনাকে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সহিহ হাদিসে এসেছে, আদম (আ.)-এর সময় থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের মতো বড় ফেতনা আর সৃষ্টি হবে না কখনো। তাই দাজ্জালের আগমন কবে হবে, তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই মুসলমানদের মনে প্রশ্ন বিরাজ করে।
তবে এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুসলমানরা কীভাবে এই ফেতনা থেকে নিজেদের ঈমান রক্ষা করবে। কোন উপায়ে নিজেদের প্রস্তুত রাখবে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ানক ফেতনার জন্য?
ইসলামী বর্ণনায় দাজ্জাল হবে একচোখা, কপালে ‘কাফির’ লেখা সংবলিত একজন মানুষ। প্রত্যেক মুমিন তার কপালস্থিত ‘অবিশ্বাসী’ শব্দটি পড়তে পারবে, সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত।
দাজ্জাল আবির্ভূত হয়েই নিজেকে খোদা হিসেবে দাবি করবে এবং মানুষের সামনে নানা অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করবে। সহিহ মুসলিম ও বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, দাজ্জাল বৃষ্টি নামানো, ফসল ফলানোর আদেশ করবে। সেগুলো প্রতিপালিত হবে। সে অত্যধিক ধনসম্পদের প্রাচুর্য প্রদর্শন করবে এবং জান্নাত-জাহান্নামের মতো ভ্রান্ত দৃশ্য দেখাবে। বাস্তবে তার ‘জান্নাত’ হবে জাহান্নাম এবং ‘জাহান্নাম’ হবে জান্নাত।
তবে দাজ্জালের আবির্ভাবের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে কোরআন বা সহিহ হাদিসে স্পষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। তবে কিয়ামতের বড় আলামত হিসেবে তার আগমনের কথা বলা হয়েছে। এ সব আলামতের মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, মিথ্যার প্রসার, প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত উৎকর্ষ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জ্ঞানের অযাচিত অপব্যবহার, জুলুম-নিপীড়নের আধিক্য এবং দুনিয়াবি মোহে তুমুল আচ্ছন্নতা।
এসব উদাহরণকে দাজ্জালের যুগের প্রস্তুতিমূলক পরিবেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন ইসলামী আলেমরা। বর্তমান বিশ্বের নানা সামাজিক ও নৈতিক সংকট এবং প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, দাজ্জালের আবির্ভাব কি সন্নিকটে? তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং প্রত্যেক যুগেই মুমিনদের জন্য সতর্ক থাকা ফরজ।
দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হলো বিশুদ্ধ আকিদা লালন এবং ঈমান মজবুত রাখা। আল্লাহর তাওহিদের ওপর অটল বিশ্বাস থাকলে কোনো মিথ্যা খোদার দাবিতে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন। সহিহ হাদিস অনুযায়ী, ফরজ নামাজের শেষ তাশাহহুদের পর দাজ্জাল, কবরের আজাব, দুনিয়া ও আখিরাতের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া পড়া সুন্নত।
সূরা কাহফ দাজ্জালের ফেতনা থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। অন্য বর্ণনায়, শেষ দশ আয়াতের কথাও এসেছে। তাই নিয়মিত সূরা কাহফ তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইলমে দ্বিন অর্জনও দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার শক্তিশালী ঢাল। অজ্ঞতা মানুষকে সহজেই বিভ্রান্ত করে। কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞান, সহিহ আকিদা এবং আলেমদের সঠিক ব্যাখ্যা অনুসরণ করলে ভ্রান্ত প্রচারণা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
একই সঙ্গে দুনিয়ার লোভ, ক্ষমতা ও অলৌকিকতার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ পরিহার করতে হবে, কারণ দাজ্জালের ফেতনার মূল অস্ত্রই হবে এসব।
সবশেষে, দাজ্জালের আবির্ভাবের সময় নিয়ে অনুমানের চেয়ে প্রস্তুতি বেশি জরুরি। ঈমানের দৃঢ়তা, আমলের শুদ্ধতা, নিয়মিত ইবাদত ও আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনাই একজন মুমিনকে যে কোনো যুগের ফেতনা থেকে রক্ষা করতে পারে।
#আরএ

