নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্যে তত বেশি দৃপ্ত হয়ে ওঠে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দবন্ধের আনাগোনা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল থেকে বিরোধী শিবির–প্রায় সকলে এই শব্দদ্বয় ব্যবহার করে একে অপরকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করে। কখনো সতর্কবার্তা, কখনো হুঁশিয়ারি, আবার কখনো প্রতিরোধের ঘোষণার সঙ্গে উচ্চারিত হয় শব্দটি।
কিন্তু ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং আসলে কী, আর কেন নির্বাচনের মৌসুম এলেই বাংলাদেশে এই বিতর্ক সামনে আসে, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। সে দিকে আলোকপাত করেছে বিবিসি বাংলা।
রাজনীতি ও নির্বাচনবিষয়ক পরিভাষা হিসেবে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। ২০১২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিপ্পা নরিস তার গবেষণাগ্রন্থ Electoral Engineering: Voting Rules and Political Behavior-এ বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তাঁর মতে, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক নিয়ম, কাঠামো ও প্রক্রিয়ায় পরিকল্পিত পরিবর্তন বা হস্তক্ষেপই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য থাকে বিশেষ রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারের আচরণকে প্রভাবিত করে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করা।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে এমনভাবে ‘ডিজাইন’ বা ‘ম্যানিপুলেট’ করা, যাতে একটি নির্দিষ্ট পক্ষ সুবিধা পায়। এই প্রক্রিয়াই হলো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কখনো আইন ও নিয়মের ভেতর থেকে করা হয়। আবার কখনো তা হয় স্পষ্টভাবে অনৈতিক ও বেআইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয়। মূলত কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি এতে হোক হিসেবে কাজ করে।
এ ক্ষেত্রে কোথাও নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে প্রভাব তৈরি করা হয়। কোথাও বদলে দেওয়া হয় ভোটিং পদ্ধতি। আবার কোথাও নির্বাচনী আইন এমনভাবে সংশোধন করা হয়, যাতে বিরোধী পক্ষ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। কোনো কোনো রাষ্ট্রে এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যুক্তিতে প্রয়োগ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি মূলত নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে এটি নির্বাচনকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার একটি কৌশল হিসেবে পরিচিত।
ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা, ভোটকেন্দ্রে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের বাধা দেওয়া, জোর করে ভোট আদায়, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট গণনায় কারচুপি, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার মতো অভিযোগ সাধারণত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ হিসেবে আলোচিত হয়।
বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন শক্তিই মূলত এই প্রক্রিয়ায় সুবিধা নিতে সক্ষম হয়। তিনি মনে করেন, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই সুযোগ পেলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে আগ্রহী হয়। তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে কারা তা বাস্তবায়ন করতে পারে।
আদতে, বাংলাদেশে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটির ব্যবহার বাড়তে শুরু করে মূলত ২০০১ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। এর আগে নির্বাচনী কারচুপি, জালিয়াতি বা ভোট চুরির অভিযোগ থাকলেও ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটি তখন রাজনৈতিক আলোচনায় তেমন প্রচলিত ছিল না।
২০০০ সালের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও একাডেমিক আলোচনায় শব্দটির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এটি জায়গা করে নেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, নির্বাচনের মৌসুমে এই আলাপ ওঠার একটি প্রধান কারণ হলো নির্বাচনকেই ক্ষমতার মূল উৎস হিসেব বিবেচনা করা।
নির্বাচনী মৌসুমে ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকা রাজনৈতিক দলগুলো আশঙ্কা করে, প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ব্যবহার করে ফল নিজেদের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেই আশঙ্কা থেকেই আগাম অভিযোগ, সতর্কতা ও রাজনৈতিক বক্তব্যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি ঘুরে ফিরে আসে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়। বরং এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত একটি বিতর্কিত ইস্যু। যতদিন না নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি সব পক্ষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন নির্বাচন এলেই এই শব্দটির রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকাই স্বাভাবিক।
#আরএ

