যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক প্রয়াত জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজনীতিক লর্ড পিটার বেঞ্জামিন ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠতার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাজ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এই বিতর্কের জেরে এবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি পদত্যাগ করেছেন।
মূলত, লর্ড ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন মরগান ম্যাকসুইনি। শেষ পর্যন্ত এটিই তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রোববার এক বিবৃতিতে মরগান ম্যাকসুইনি জানান, গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার পর তিনি সরকারের পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “পিটার ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এই সিদ্ধান্ত আমাদের দল, আমাদের দেশ এবং রাজনীতির ওপর জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
তিনি আরও স্বীকার করেন, এই নিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে তিনিই পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং এর সম্পূর্ণ দায় তিনি নিজে গ্রহণ করছেন।
এর আগে এপস্টিন-সংক্রান্ত বিতর্কের মুখে লর্ড ম্যান্ডেলসনকে শুরুতে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি লেবার পার্টির সদস্যপদও ত্যাগ করেন।
মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানুয়ারির শেষ নাগাদ এপস্টিনের নতুন নথি প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এসব নথিতে উঠে আসে, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে জেফরি এপস্টিন তিনটি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে লর্ড ম্যান্ডেলসনকে মোট ৭৫ হাজার ডলার প্রদান করেছিলেন।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। লেবার পার্টির একাধিক আইনপ্রণেতা লর্ড ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত করার সিদ্ধান্তের জন্য মরগান ম্যাকসুইনিকে দায়ী করেন এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন।
তাঁদের অভিযোগ, রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সময় লর্ড ম্যান্ডেলসনের অতীত কর্মকাণ্ড ও বিতর্কিত সংযোগ যথাযথভাবে যাচাই করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীরাও একই ধরনের অভিযোগ তুলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
৪৮ বছর বয়সী মরগান ম্যাকসুইনি লর্ড ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাই রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সরকার ও লেবার পার্টির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে দাবি করেন সমালোচকেরা।
তবে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মরগান ম্যাকসুইনির পদত্যাগের পর এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করা ছিল ‘সম্মানের বিষয়’। স্টারমার জানান, মরগান ম্যাকসুইনি ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এবং এই সময়কালে তিনি নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, লর্ড ম্যান্ডেলসন ব্রিটিশ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের প্রশাসনে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ১৯৯২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ছিলেন। তবে এপস্টিন-সংক্রান্ত নতুন তথ্য প্রকাশের পর তাঁর রাজনৈতিক অতীত ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং উচ্চপর্যায়ের নিয়োগে যাচাই-বাছাইয়ের গুরুত্ব আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি লেবার সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একের পর এক বিতর্ক দলটির ভাবমূর্তি ও নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
A

