শুভ কর্মকার | বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। এটি শুধু একটি পরীক্ষাই নয়; বরং বছরের পর বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম, ত্যাগ ও স্বপ্নের চূড়ান্ত মূল্যায়ন।
প্রতিটি শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে—একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে, নিজেকে গড়ে তুলবে, পরিবার ও দেশের জন্য কিছু করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই স্বপ্ন সবার জন্য সমান সুযোগ নিয়ে আসে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ হয়ে যায় গুটি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার মধ্যেই।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৮টির মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারি এবং কিছু নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর অধীনে পরিচালিত হয়।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের উচ্চশিক্ষার মেরুদণ্ড। কিন্তু এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও একজন সাধারণ শিক্ষার্থী সবগুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না—মূলত অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে। আলাদা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ফি, যাতায়াত ব্যয়, আবাসন খরচ এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে ভর্তি পরীক্ষা মধ্যবিত্ত ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য একপ্রকার আর্থিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক বিষয় হলো ভর্তি পরীক্ষার ফি। যেখানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মতো দেশের একটি সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফি মাত্র ২০০ টাকা, সেখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফি হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি।
প্রশ্ন জাগে, একজন শিক্ষার্থী রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে ২০০ টাকায়, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতে তাকে দিতে হয় তার পাঁচগুণ বা দশগুণ ফি কেন? এই বৈষম্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে শিক্ষা ধীরে ধীরে একটি ব্যয়বহুল পণ্যে রূপ নিচ্ছে।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ইউজিসির উদ্যোগে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চালু হওয়া সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বা ‘গুচ্ছ পদ্ধতি’ ছিল আশার আলো। এক পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের খরচ যেমন কমেছিল, তেমনি মানসিক চাপও হ্রাস পেয়েছিল। বিশেষ করে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যবস্থা ছিল একটি ন্যায্য সুযোগ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই কার্যকর ব্যবস্থাটিই এখন ভেঙে পড়ার পথে।
বর্তমানে ইউজিসি কর্তৃক পরিচালিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার আওতায় মাত্র ১৯টি সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এক সময় এই সংখ্যা ছিল ২৪টি। সাম্প্রতিক সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে গেছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—তারা গুচ্ছভুক্ত থাকলে সমস্যা কোথায় ছিল? নাকি এতে করে তাদের ‘শিক্ষা-নামক ব্যবসা’ কিছুটা কমে যাচ্ছিল?
বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের সেরা মেধাবীদের খুঁজে বের করে। সেখানে লক্ষ্য থাকে সমতা, স্বচ্ছতা ও সুযোগের ন্যায়সংগত বণ্টন। অথচ বাংলাদেশে হওয়া উচিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক হয়ে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম ব্যবহার করে গুচ্ছভুক্ত অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি জটিলতায় পড়েন গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে বেড়ানো, অতিরিক্ত ফি ও যাতায়াত ব্যয় বহন করা—সব মিলিয়ে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
একসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা হলে সত্যিই হাজারো স্বপ্ন বাঁচত, কমত অসহায়ত্ব। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক অধিকার। তাই শিক্ষাকে ব্যবসা নয়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সময় এখনই।
লেখক: শুভ কর্মকার,
শিক্ষার্থী ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
#

