মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত গোপন নথি প্রকাশের পর থেকেই যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পালাক্রমে বিতর্কিত কাণ্ডের জেরে চাপের মুখে পড়েছে কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের চিফ অব স্টাফসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এরই মধ্যে। এমতাবস্থায়, সরকারের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠছে দেশটির রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে।
এমন সংকটময় মুহূর্তে প্রথমবারের মতো ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন মুসলিম নারী রাজনীতিক শাবানা মাহমুদ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, স্টারমার সরকারের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ায় লেবার পার্টির ভেতর বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শাবানা মাহমুদ। পেশায় একজন খ্যাতিমান ব্যারিস্টার শাবানা লেবার পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম মুখ।
স্টারমারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হলেও নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও বাগ্মিতার কারণে দলের ভেতর স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছেন শাবানা। দলটির ডান ঘরানার গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা শাবানা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন।
১৯৮০ সালে দেশটির বাকিংহামে জন্ম নেওয়া শাবানা মাহমুদ ব্রিটেনে জন্মালেও তাঁর পারিবারিক শিকড় পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন আজাদ কাশ্মীরের মিরপুর অঞ্চলে। ষাটের দশকের শেষ দিকে তাঁর পরিবার ব্রিটেনে বসবাস শুরু করে।
শিক্ষাজীবনেও শাবানা ছিলেন অত্যন্ত অগ্রণী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংকন কলেজ থেকে ২০০২ সালে আইন বিষয়ে স্নাতক অর্জনের পর ২০০৩ সালে ব্যারিস্টার হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন এই নারী। আইন পেশায় সুনাম অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে রাজনীতির ময়দানে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে থাকেন তিনি।
মূলত, শাবানার রাজনৈতিক অভিষেক ঘটে ২০১০ সালে। ওই বছর তিনি বাকিংহামের লেডিউল আসন থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনটিতে প্রায় ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পান তিনি।
সেই সংসদে সামাজিক ও নাগরিক অধিকার ইস্যুতে প্রথাবিরুদ্ধ অবস্থানের কারণে একাধিকবার আলোচনায় আসেন শাবানা। বিশেষ করে, ২০১৩ সাল নাগাদ সমকামী বিয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
একইভাবে, ২০১৯ সালে পার্লামেন্টে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এলজিবিটিকিউ বিষয়ক সম্পর্ক ও যৌন শিক্ষা (আরএসই) পাঠ্যক্রম পড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বয়স ও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত। পাশাপাশি এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্য লেবার পার্টির ভেতর ও বাইরে সমালোচনার জন্ম দেয়।
তবে সমালোচনা সত্ত্বেও শাবানার রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা স্তম্ভিত হয়নি। ২০২৩ সালে দ্য স্টেটসম্যান কর্তৃক প্রকাশিত সেরা ২০ জন প্রভাবশালী ব্রিটিশ বামপন্থী রাজনীতিকের তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। পরের বছর তিনি প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন। একই বছরে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম এবং তৃতীয় নারী হিসেবে লর্ড চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পান শাবানা মাহমুদ।
পরে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের আমলে পররাষ্ট্র সচিব ও লর্ড চ্যান্সেলরের দ্বৈত দায়িত্ব পান শাবানা। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রাজ্য সচিব পদে আসীন হন।
এ দিকে, সমসাময়িক সময়ে এপস্টেইন কাণ্ডের জেরে স্টারমার সরকার রাজনৈতিক চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় লেবার পার্টির ভেতরে নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের সম্ভাবনা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। সেই আঙ্গিক থেকে শাবানা মাহমুদকে ঘিরে প্রত্যাশা বাড়ছে দলটির অভ্যন্তরে।
ব্রিটিশ রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ধারণা, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে, ব্রিটেনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারেন ৪৫ বছর বয়সী এই মুসলিম নেত্রী।
সূত্র: শীর্ষনিউজ
#আরএ

