ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি ও মিত্র দেশগুলোকে সরাসরি সংঘাতের ময়দানে টেনে এনেছে। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে এক মহাপ্রলয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বর্তমানে কোন দেশ কীভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত দেশসমূহ
- যুক্তরাষ্ট্র: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শনিবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার গুঁড়িয়ে দিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেন। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
- ইসরায়েল: যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে ইসরায়েল। তাদের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় ডজনখানেক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
- যুক্তরাজ্য: সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সাইটগুলোতে হামলা চালাতে রয়্যাল নেভির ডেস্ট্রয়ার এবং বিশেষ হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
ইরানি হামলার শিকার উপসাগরীয় দেশসমূহ
- সংযুক্ত আরব আমিরাত: যুদ্ধের শুরু থেকে আমিরাত অন্তত ৮০০টি প্রজেক্টাইল হামলার শিকার হয়েছে। দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহর একটি বিলাসবহুল হোটেল এবং গুরুত্বপূর্ণ জেবেল আলী বন্দরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। আমিরাত এখন পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছে।
- কাতার: জ্বালানি স্থাপনায় ইরানি ড্রোন হামলার পর কাতার তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন স্থগিত করেছে। এছাড়া কাতারি বিমান বাহিনী ইরানের দুটি সু-২৪ (Su-24) যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
- কুয়েত ও বাহরাইন: কুয়েতে ইরানি হামলায় প্রথম মার্কিন সেনা নিহত হয়। অন্যদিকে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের সদর দপ্তরের কাছে এবং আবাসিক এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান।
- সৌদি আরব: রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে হামলা ছাড়াও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, সৌদি আরবও যুদ্ধের ময়দানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব
- লেবানন ও হিজবুল্লাহ: ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে হিজবুল্লাহ ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করেছে এবং বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর বেশ কয়েকজন কমান্ডারসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন।
- জার্মানি ও ফ্রান্স: শুরুতে আলোচনার কথা বললেও জর্ডানে জার্মান সেনা ক্যাম্পে ইরানি হামলার পর দেশ দুটি কঠোর অবস্থানে গেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুদ্ধের পরবর্তী কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন।
- আজারবাইজান ও সাইপ্রাস: আজারবাইজানের বেসামরিক এলাকায় ড্রোন হামলার পর দেশটি সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে হামলার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধের আবহে জড়িয়ে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। এই সংঘাত কেবল দেশগুলোর সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও এক ভয়াবহ অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

