বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাম মুসলিম। ধর্মটিতে নানা মত ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা থেকে সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মাজহাব বা মতবাদ। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত দুটি ধারা হলো শিয়া ও সুন্নি।
ইতিহাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং নেতৃত্বের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ তৈরি হলেও মৌলিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর মিল।
শিয়া–সুন্নি বিভেদের মূল সূত্রপাত ইসলামের প্রথম যুগে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম নেতৃত্ব বা খিলাফতের প্রশ্নে। সুন্নি মত অনুসারে, নবীজির পর মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং সাহাবিদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রথম খলিফা হিসেবে হজরত আবু বকর (রা.) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে হজরত ওমর (রা.), হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে শিয়া মতবাদে বিশ্বাস করা হয়, নবীজির পর মুসলমানদের নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং সে অনুযায়ী হজরত আলী (রা.)-কেই তাঁর সরাসরি উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। এই বিশ্বাস থেকেই শিয়া মতবাদে ইমামত ধারণা গুরুত্ব পায় এবং হজরত আলী (রা.) ও তাঁর বংশধরদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়।
এই ঐতিহাসিক মতভেদের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিয়া ও সুন্নি আলাদা ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও কিছু আলাদা অনুশীলন গড়ে তোলে। তবে মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
উভয় সম্প্রদায়ই এক আল্লাহতে বিশ্বাস করে, পবিত্র কোরআনকে একমাত্র আসমানি গ্রন্থ হিসেবে মেনে চলে এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একইভাবে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, কিয়ামত দিবস এবং পরকালের হিসাবের প্রতি বিশ্বাসের মতো মৌলিক ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রেও উভয় পক্ষ একমত।
শিয়াদের সম্পর্কে প্রচলিত একটি অভিযোগ হলো তারা নাকি রাসূল (সা.)-কে নবী হিসেবে মানে না। তবে ইসলামী গবেষণা ও শিয়া ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় দেখা যায়, এই দাবি সঠিক নয়।
শিয়া মুসলমানরাও বিশ্বাস করে যে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ই আল্লাহর সর্বশেষ নবী এবং তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না। এই বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক আকিদার অংশ হিসেবে তারা মেনে চলে।
শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যে হজরত আলী (রা.)-এর বাণী ও ভাষণসমূহের সংকলন ‘নাহজুল বালাগা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে বহু স্থানে হজরত আলী (রা.)-এর বক্তব্যে মহানবী (সা.)-কে সর্বশেষ নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে শিয়ারা নবীজির নবুওত অস্বীকার করে, এমন ধারণাকে অনেক গবেষক ভিত্তিহীন বলে মনে করেন।
আবার, ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা বহু অঞ্চলে একসঙ্গে বসবাস করেছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার লড়াই কিংবা ভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে মাঝে মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দিলেও বহু যুগ ধরে তারা একই সমাজে সহাবস্থান করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিম সভ্যতার বিকাশেও উভয় ধারার মানুষের অবদান রয়েছে।
সমসাময়িক বিশ্বে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ধর্মীয় মতভেদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও শিয়া–সুন্নি দ্বন্দ্বকে অনেক সময় উসকে দেয়। বিভিন্ন দেশে সংঘাতের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ জড়িত থাকার কথাও আলোচনায় আসে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব। কোরআনে মুসলমানদের একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই অনেক আলেম মনে করেন, মতভেদ থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই মুসলিম সমাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

