ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম মুসলমানদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই মাসের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ নামে পরিচিত, যা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন।
আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে আশুরা শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ দশ। অর্থাৎ মহররমের দশম দিনকে কেন্দ্র করেই এ দিনের নামকরণ। ইতিহাস, ধর্মীয় শিক্ষা এবং ইবাদতের দিক থেকে আশুরা মুসলিম সমাজে গভীর তাৎপর্য বহন করে।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এই দিনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মহান আল্লাহর কুদরতে হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীর সাগরে ডুবে ধ্বংস হওয়া। এই ঘটনার স্মরণে হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রোজা পালন করেছিলেন।
হাদিসের বর্ণনায় জানা যায়, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের কাছে জানতে চান, এ দিনের তাৎপর্য কী।
উত্তরে তারা জানায়, এ দিনেই আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউনকে ধ্বংস করেছেন। তাই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তারা এই দিনে রোজা পালন করে থাকে।
এই কথা শুনে নবীজি (সা.) বলেন, হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মুসলমানরাই বেশি অধিকারী। এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা পালন করেন এবং মুসলমানদের তা পালনের নির্দেশ দেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত এই ঘটনাটি আশুরার রোজার গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
তবে মুসলমানদের রোজা পালনের ক্ষেত্রে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সামঞ্জস্য এড়াতে নবীজি (সা.) একটি বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। সাহাবিরা যখন তাঁকে বলেন যে ইহুদিরাও এ দিনে রোজা পালন করে, তখন তিনি বলেন, তারা যদি শুধু ১০ তারিখে রোজা রাখে, তাহলে মুসলমানরা ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা রাখবে।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ বা ১১ তারিখ যুক্ত করে রোজা রাখাই উত্তম। এ নির্দেশনার মাধ্যমে মুসলমানদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখার দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে।
হাদিসে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কেও উল্লেখযোগ্য বর্ণনা রয়েছে। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.)-কে যখন আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,এই রোজা বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়। এই বাণী আশুরার রোজাকে মুসলমানদের কাছে বিশেষভাবে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছে।
অন্যদিকে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, রমজানের ফরজ রোজার পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। অর্থাৎ এই মাসের নফল ইবাদতও আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা রাখে। এ কারণে অনেক মুসলমান মহররম মাসে অতিরিক্ত রোজা ও ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (সা.) অন্যান্য দিনের তুলনায় আশুরার রোজার ফজিলত অর্জনের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখাতেন। যেমন তিনি রমজানের রোজার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিতেন, তেমনি আশুরার রোজার প্রতিও তাঁর আলাদা মনোযোগ ছিল।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী আশুরা কেবল একটি ঐতিহাসিক দিনের স্মরণ নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, ইবাদত বৃদ্ধি এবং আত্মশুদ্ধির একটি সুযোগ। মহররমের ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখে রোজা পালন করার মাধ্যমে মুসলমানরা নবীজির সুন্নত অনুসরণ করতে পারে এবং অতীতের শিক্ষা থেকে নিজেদের জীবনে নতুন প্রেরণা গ্রহণ করতে পারে।

