ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত মাসে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মনোরেলকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন রাজধানীর একটি সভায়।
এরপর থেকেই দেশের নাগরিকদের মাথায় ঘুরছে কিছু প্রশ্ন–কী এই মনোরেল? কেন দরকার এটি বাংলাদেশে? আসলেই কি দেশের জন্য এটি যুগোপযোগী হবে?
মনোরেল আসলে কী?
সাধারণত, মনোরেল হলো এমন এক ধরনের রেল যোগাযোগ পদ্ধতি, যেখানে ধাতব ট্র্যাকের পরিবর্তে ফ্লাইওভারের বিমের ওপর দিয়ে হালকা গড়নের রেল বাহন চলাচল করে থাকে। এটি ফ্লাইওভারের গ্রিডের নিচে ঝুলিয়ে কিংবা পাতালেও স্থাপন করা যেতে পারে। টানেল অবকাঠামোতেও এটি চলনসই।
এই ব্যবস্থায় শুধু সিঙ্গেল ট্র্যাক থাকে। ফলে স্বল্প স্থানের মধ্যেই পুরো কাঠামো বিদ্যমান থাকতে পারে।
মনোরেলের উদ্ভব যেভাবে
আদতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ইউরোপ, বিশেষত যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও জার্মানির প্রকৌশলীদের মাথায় এই ধারণাটির জন্ম হয়। ১৮০০ সাল নাগাদ তাঁরা একক বিম কিংবা উঁচু স্থাপনার ওপর দিয়ে তুলনামূলক কম ওজনের ঘোড়ার গাড়ি ও কাঠের যানের রেকের সাহায্যে যাত্রী এবং মালামাল বহনের বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন।
এরই ধারাবাহিকতায়, ১৮২০ সালে রুশ বিজ্ঞানী ইভান এলমান্ড কাঠ নির্মিত একটি সিঙ্গেল রেল ট্র্যাক তৈরি করেন এই ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। এটিকেই নগরবিদেরা মনোরেল উদ্ভাবনের প্রথম পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে থাকেন।
তবে মনোরেলের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে যায় ইউরোপের অপর প্রান্তে। এলমান্ডের উদ্ভাবনের এক বছরের মাথায় ১৮২১ সালে যুক্তরাজ্যের প্রকৌশলী হেনরি রবার্টসন পালমার মনোরেল ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ মডেল উদ্ভাবন করে নিজের নামে পেটেন্ট সংগ্রহ করেন। এরপর ১৮২৫ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের চেশান্ট রেলওয়ে বাণিজ্যিকভাবে মনোরেল ব্যবস্থায় যাত্রী পরিবহন শুরু করে।
মনোরেলের বিস্তৃতি কোথায় কোথায়?
মনোরেলের ধারণা বেশ অনন্য হলেও, বিশ্বের সব স্থানে সমানভাবে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। ভিন্ন আঙ্গিকের অবকাঠামোগত পদক্ষেপ এবং পরিচালন পদ্ধতির কারণে সকল দেশ এটিকে এখনও সার্বজনীন যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ।
তবুও বেশকিছু উন্নত দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মনোরেলের তুমুল কদর রয়েছে। এই তালিকায় সবার প্রথমে রয়েছে জাপান। দেশটির টোকিও, ওসাকা, চিবা, কিতাকিউশুর মতো শহরগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মনোরেল সমাদৃত হয়ে আসছে।
একইভাবে, চীনের পাহাড়ি ও ঘনবসতিপূর্ণ চংকিং প্রদেশে মনোরেল কার্যকর যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও ইনচন অঞ্চলের বাসিন্দারা ব্যাপক হারে এই পরিষেবা ব্যবহার করে থাকেন।
অপর দিকে, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরের যানজট নিরসনেও মনোরেল ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। মালয়েশিয়ার কুয়ালামাপুরের পর্যটকদের কাছেও এটি ভিন্না মাত্রার বাহন। সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ নগর যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে মনোরেলকে ব্যবহার করা হয়।
পাশাপাশি, খোদ মার্কিন মুলুকের লাস ভেগাস, সিয়াটল ও ডিজনি ল্যান্ড এলাকাগুলোতেও এই যানের চল আছে। আর জার্মানির ভুপারটালে মনোরেল ‘শতাব্দীর পুরানা’ ঐতিহাসিক বাহন হিসেবে মনোরেলের খ্যাতি রয়েছে।
মনোরেল ব্যবহারের সুবিধাসমূহ
মনোরেল খুবই দ্রুতগতির একটি বাহন। একইসঙ্গে, তুলনামূলক হালকা ভরের হওয়ায় এটি অনেকটা নিরাপদ। শুধু সিঙ্গেল লাইনে পরিচালনার সুযোগ থাকায় মেট্রোরেল বা অন্যান্য ব্যবস্থার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম জায়গা ব্যবহার করেই এর অবকাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে। যানজটের ঝক্কি-ঝামেলা হ্রাসে এটি কার্যকর হতে পারে।
পাশাপাশি, বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে মনোরেল কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া, এটির শব্দ দূষণ সৃষ্টির হারও কম বলে মনে করেন নগরবিদেরা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মনোরেল ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের বড় বড় মহানগরগুলোতে তীব্র যানজট এবং সড়কের ভোগান্তি হ্রাসে মনোরেল একটি কার্যকর উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন নগরবিদেরা।
বিশেষ করে রাজধানী শহর ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সড়কে বিদ্যমান অত্যধিক মাত্রার যানবাহনের চাপ কমাতে মনোরেল ব্যবস্থা হতে পারে চমৎকার বিকল্প।
উপরন্তু, মেট্রোরেলের অবকাঠামোর মতো অতিরিক্ত খোঁড়াখুঁড়ির কার্যক্রমেরও প্রয়োজন না পড়ায় এটি জনদুর্ভোগও ব্যাপক হারে হ্রাস করতে পারে। আবার, মেট্রোরেল যোগাযোগ সবস্থানে নির্মাণ সম্ভব না হওয়ায়, মনোরেল দরকারি স্থানগুলোতে তার পরিপূরক হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
এসব দিক বিবেচনায় মনোরেল বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যুগান্তকারী মাত্রায় উন্নীত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এরপরও কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও এক্ষেত্রে বিরাজমান।
বিশেষত, বিগত সরকারের আমলে হওয়া ব্যাপক আর্থিক লুটপাট, অর্থ পাচার এবং মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কায় বর্তমানে মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অনেক জটিল পদক্ষেপ হতে পারে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। এ ছাড়া, এটির রুট একমুখী হওয়ায়, পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুসারে তা পরিবর্তন করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অধিকন্তু, মেট্রোরেলের চেয়ে মনোরেলের যাত্রী ধারণ ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেশ কম। এ কারণে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এটি লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় দরকার।
এতকিছুর পরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আসন্ন সরকার মনোরেল নিয়ে কী পরিকল্পনা নিয়ে আগাবে–সেটিই এখন দেখার বিষয়।
#আরএ

