ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় নানা মতবাদ ও চিন্তাধারার উদ্ভব হয়েছে। এরই একটি আলোচিত ও বিতর্কিত ধারা হলো কাদিয়ানি সম্প্রদায়। সাধারণভাবে এই সম্প্রদায়কে আহমদিয়া নামেও আখ্যা দেওয়া হয়। এদের বিশ্বাস ও রীতিনীতিতে বিস্তর তফাৎ থাকায় মূলধারার মুসলিম সমাজে এই সম্প্রদায়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মতাত্ত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলমান।
আদতে, কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সূচনা ঘটে উনিশ শতকের শেষভাগে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে। এই মতবাদের প্রবর্তক ছিলেন মীর্হা গোলাম আহমদ।
১৮৮৯ সালে আহমদ নিজেকে ইসলামের সংস্কারক (মুজাদ্দিদ) হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দাবি করেন, তিনিই প্রতিশ্রুত মসিহ ও ইমাম মাহদি। তার এই দাবিই মূলত কাদিয়ানি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
ইসলামের মূলধারার বিশ্বাস অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শেষ নবী। কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে নবুয়তের সমাপ্তির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু মির্জা গোলাম আহমদের বক্তব্য ও লেখায় নবুয়তের ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যায়।
তবে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের দাবি, আহমদ শরিয়াহপ্রণেতা নবী নন; বরং নবুয়তের অধীনস্ত এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এই ব্যাখ্যাকে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ আলেম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করেননি।
এই মতবাদের অনুসারীরা নিজেদের সংগঠিত করেন আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়-এর ব্যানারে। তাদের নিজস্ব খলিফা ব্যবস্থা রয়েছে, যিনি ধর্মীয় ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব দেন। বিশ্বব্যাপী এই সম্প্রদায়ের অনুসারী রয়েছে ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। তারা নিজেদের শান্তিপ্রিয় ও ইসলাম প্রচারক হিসেবে তুলে ধরে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের কথাও বলে থাকে।
তবে ধর্মীয় বিতর্কের পাশাপাশি কাদিয়ানিদের ঘিরে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান-এ এই ইস্যু সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করে।
১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে সংশোধনী এনে আহমদীয়াদের আনুষ্ঠানিকভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে তাদের ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার, আজান দেওয়া বা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেওয়ার ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এসব বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকার বিতর্কের জন্ম দিলেও পাকিস্তানের মূলধারার ধর্মীয় অবস্থান এতে অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাংলাদেশেও কাদিয়ানি সম্প্রদায় একটি সংবেদনশীল ইস্যু। এখানে তারা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সময় তাদের বই প্রকাশ, সভা-সমাবেশ বা ইসলামি পরিভাষা ব্যবহারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ দেখা গেছে।
মূলধারার ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, আকিদাগত পার্থক্যের কারণে কাদিয়ানিদের মুসলিম পরিচয় দেওয়া বিভ্রান্তিকর। কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ঘিরে বিতর্কের মূল কারণ আকিদা বা বিশ্বাসগত। নবুয়তের চূড়ান্ততা ইসলামের মৌলিক ভিত্তির অংশ হওয়ায় এই প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই বলে মনে করেন অধিকাংশ মুসলিম আলেম।
অন্য দিকে আহমদিয়া সম্প্রদায় নিজেদের মুসলিম পরিচয় বজায় রেখে আলাদা ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এই দুই অবস্থানের সংঘাত থেকেই কাদিয়ানিদের ঘিরে সামাজিক উত্তেজনা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ধারাবাহিক বিতর্কের জন্ম হচ্ছে বারবার। ফলে আজও মুসলিম বিশ্বে একটি সংবেদনশীল বাস্তবতা হিসেবে রয়ে গেছে এই ‘কাদিয়ানি বিতর্ক’।
#আরএ

