ইসলাম ধর্মে সর্বদাই বিয়েকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক ঐক্যবদ্ধতা বিনির্মাণে এর কোনো বিকল্প নেই শরিয়ত মোতাবেক। তাই অনেক ইসলামি স্কলারের মতে, বিয়ে হলো অর্ধেক দ্বীন পালনের সমান।
তবে প্রত্যেক মুসলমানই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যে প্রশ্নটি প্রায়শই করে থাকেন, তা হলো সুন্নতি বিয়ের আসল নিয়ম কী? এর জন্য করণীয় কী কী হতে পারে? বিভিন্ন ইসলামি স্কলার এ বিষয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট পথ বাতলে দিতে চেষ্টা করেছেন। মোটের ওপর সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হলো।
সুন্নতি বিয়ে আসলে কী?
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সুন্নতি বিয়ে হলো মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা) ও শ্রেষ্ঠ মনীষীদের আদর্শ মোতাবেক শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কার্যক্রম।এর মাধ্যমে যেমন মহান আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তেমনি নতুন জীবনের সূচনা অফুরন্ত বরকত ও রহমত পাওয়া যায়।
প্রথম অনুষঙ্গ সম্মতি
সুন্নতি বিয়েতে প্রথম ও প্রধান যে অনুষঙ্গ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো সম্মতির দায়৷ হবু বর ও কনে যদি বিয়েতে সম্মতি দেন, তবেই সকল কার্যক্রম শুরু করা হয়। সম্মতি ছাড়া কখনো বিয়ে সুখের হতে পারে না।
তাই সুন্নতি বিয়ের জন্য ইসলামি নিয়ম অনুসারে কন্যার বিয়েতে সম্মতি আছে কি-না তা জেনে নেবেন বিয়ের কাজি, অভিভাবক ও সাক্ষীরা। বরেরও সম্মতি নিতে হবে পরে।
সুন্নতি বিয়ের দিন
সুন্নতি বিয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত জুমার দিন তথা শুক্রবারকে বেছে নেওয়া উত্তম বহু ইসলামি স্কলারের মতে। তাদের ভাষায়, এটি করলে জনসমাগম ও ঘোষণার হার বেশি হয়। ফলে বহু মানুষের দোয়া পাওয়া সহজ হয়।
তবে এর মানে এই নয় যে, সপ্তাহের অন্যান্য দিন সুন্নতি তরিকায় বিয়ে করা যাবে না। মূলত সুন্নতি ধারার মৌলিক বিষয়াদি মেনে চললে যে কোনো দিনই এ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যেতে পারে।
সুন্নতি বিয়ের স্থান
বহু স্কলারদের দাবি, সুন্নতি বিয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো স্থান হিসেবে মসজিদকে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিয়ের জন্য বর ও কনেপক্ষের অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীবৃন্দ মসজিদে উপস্থিত থাকবেন। সেখানে বিয়ের খুতবা পাঠ করতে হবে। তার আগে কন্যার সম্মতি নিয়ে আসবেন অভিভাবকেরা।
সুন্নতি বিয়ের নিয়ম
অভিভাবক বিয়ে পড়াতে সক্ষম হলে নিজে কিংবা স্থানীয় আলেম বিয়ে পড়াবেন। এ সময় বিয়ের খুতবা পাঠ করতে হবে। একই সময়ে, কন্যার অভিভাবক বরের সামনে কন্যার পরিচয় ও মোহরের পরিমাণ উল্লেখ করবেন। তারপর তিনি বিবাহের প্রস্তাব পেশ করবেন।
ক্ষেত্রবিশেষে অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে বিবাহ পড়ানোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হবু বরের কাছে বিয়ের প্রস্তাব তুলে ধরবেন। ইসলামের ভাষায় এটি ‘ইজাব’ বলে খ্যাত।এরই ধারাবাহিকতায় বিয়ে পড়ানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কন্যার পরিচয় ও মোহরানার অঙ্কের কথা উল্লেখ করে হবু বরের কাছে বিয়ের প্রস্তাবনা রেখে তিনি তা ‘কবুল’ বা ‘আমি গ্রহণ করছেন’ কি-না জানতে চাইবেন। বর গ্রহণ করলেই বিয়ে সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য, আগে খুতবা পাঠ শেষে ইজাব-কবুল (প্রস্তাব দেওয়া-নেওয়া) সম্পন্ন করতে হবে।
সুন্নতি বিয়ের খুতবা
সুন্নতি বিয়ের খুতবার জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট পন্থায় হামদ ও ছানা বা আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। সুনানে আবু দাউদের ২১১৮ নম্বর হাদিস মোতাবেক এরপর পবিত্র কুরআনের তিনটি আয়াত পাঠ করতে হবে।
এগুলো যথাক্রমে সুরা নিসার আয়াত ১, সুরা আলে ইমরানের আয়াত ১০২ এবং সুরা আহযাবের ৭০-৭১ নম্বর আয়াত।
সুন্নতি বিয়ের দোয়া
বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবার পর উপস্থিত সবাই পৃথকভাবে সুন্নতি দোয়া পাঠ করবেন। এর মধ্য দিয়ে নতুন দম্পতির জন্য কল্যাণ কামনা করবেন সকলে।
একটি প্রসিদ্ধ দোয়া হলো: ‘বা-রাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বা-রাকা ‘আলাইকা, ওয়া জামা’আ বাইনাকুমা ফি খাইর।’
অর্থ: ‘আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার ওপর বরকত দিন ও তোমাদের দুজনকে কল্যাণের সঙ্গে মিলিত করুন।’ (তিরমিজি)
খেজুর, মিষ্টিমুখ ও উদযাপন
দোয়ার পাঠ চুকানোর পর বিয়ে উপলক্ষে উপস্থিত সকলকে মিষ্টিমুখ করানো উচিত। উপস্থিত জনসাধারণের মাঝে পবিত্র ফল খেজুরও বিতরণ করা যেতে পারে।
আরব্য ইসলামি বিয়ের রীতি মোতাবেক দফরা বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে শালীনভাবে উদযাপনের বর্ণনাও এসেছে বিভিন্ন ইসলামের গ্রন্থে। সে হিসেবে বর ও কনের পরিবার-পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা একত্রিত হয়ে উত্তম ভোজ গ্রহণ করতে পারেন।
এসব উপায়ে সহজেই সুষ্ঠুভাবে সুন্নতি তরিকায় বিয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করা যেতে পারে। অনাবিল ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ অর্জনে প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নতুন জীবনের শুরুতে এসব রীতির অনুসরণ করা।

