পবিত্র রমজান মাসের এশার নামাজের পর একটা বরকতপূর্ণ ইবাদতের নাম সালাতুত তারাবি অর্থাৎ তারাবির নামাজ। হযরত মুহাম্মদ (সা) এক হাদিসে এরশাদ করেছেন, “পরিপূর্ণ ইমানের সঙ্গে পরকালে (কল্যাণের) আশায় রমজান মাসে যাঁরা কিয়ামুল লাইল তথা তারাবির নামাজ আদায় করবে, তাদের পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (নাসাঈ, ২২০৫)
তবে প্রতি বছর শুধু রমজানে এই নামাজ আদায়ের বিধান থাকায় অনেকেই প্রায়শই তারাবির নামাজের নিয়ম ভুলে যান। খেয়াল থাকে এটির নিয়ত ও দোয়ার বিষয়েও। এতে এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি কীভাবে আদায় করতে হবে, তা নিয়ে বহু প্রশ্নই জাগে অনেকের মনে। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।
তারাবির নামাজের নিয়ম
প্রথম রমজান শুরুর রাত থেকেই এশার ফরজ নামাজের পর তারাবির নামাজ আদায় করার বিধান রয়েছে। ইসলামি পঞ্জিকা অনুযায়ী আগে রাত আসায়, পহেলা রমজানের আগের রাতেই তারাবি পড়তে হয়।
দুই রাকআত করে সাধারণত তারাবির নামাজ পড়া হয়। প্রতি চার রাকআত পর পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হয়। এ সময়, তাসবিহ ও তাহলিল পাঠ করা ভালো।
তারাবির নামাজের নিয়ত
ইসলাম ধর্মে প্রত্যেক ইবাদতের জন্যই নিয়ত করার রেওয়াজ রয়েছে। তারাবির নামাজের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়।
আরবিতে তারাবির নামাজের নিয়ত হলো:نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ
للهِ تَعَالَى رَكْعَتَى صَلَوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَرْ
বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা, রাকাআতাই সালাতিত তারাবি সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তায়ালা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলা ভাবানুবাদ: আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকআত তারাবির সুন্নত আদায়ের ইচ্ছা পোষণ করছি; আল্লাহু আকবার।তবে আরবিতে নিয়ত করা আবশ্যক নয়। না জানলে, বাংলাতেও নিয়ত করা যাবে।
তারাবির নামাজের দোয়া
সাধারণভাবে, তারাবির নামাজের দুই রাকআত করে চার রাকআত পর পর বিশেষ দোয়া পাঠ করতে হয়।
দোয়াটি হলো:
سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظْمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوْتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِيْ لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوْتُ اَبَدًا اَبَدَ سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنا وَرَبُّ المْلائِكَةِ وَالرُّوْحِ
বাংলা উচ্চারণ: ‘সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইয্যাতি ওয়াল আঝমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিব্রিয়ায়ি ওয়াল ঝাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুত আবাদান আবাদ; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।’
তবে এই দোয়াটি ছাড়াও ইস্তেগফার ও কুরআন-হাদিসে বর্ণিত যে কোনো কল্যাণমূলক দোয়া পড়া যাবে। এটি পাঠ বাধ্যতামূলক নয়।
তারাবির নামাজ কয় রাকআত?
তারাবির নামাজ কয় রাকআত তা নিয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো আলেমের ভাষ্য, তারাবির নামাজ ২০ রাকআতই পড়তে হবে। আবার কারো কারোর দাবি, ৮ বা ১২ রাকআত তারাবির নামাজই যথেষ্ট।
বুখারি শরীফের ১৯০৯ হাদিস মোতাবেক, আয়েশা (রা) এরশাদ করেছেন যে, মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা) রমজান বা রমজান ছাড়া অন্য মাসে তারাবি পড়ার সময় ৮ রাকআত তারাবি ও ৩ রাকআত বিতর সালাত আদায় করতেন।
তবে মহানবি (সা)-এর ইন্তেকালের পর হযরত ওমর (র)-এর আমলে জামাতে ২০ রাকআত তারাবি আদায়ের প্রচলন হয়। এটিকে ‘ইজমা’ তথা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
খতম তারাবি নাকি সূরা তারাবি?
তারাবি নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সওয়াল হলো খতম তারাবি বা সমগ্র কুরআন কিরাতে পড়তে হবে নাকি শুধু সূরাসমূহের কিয়দংশ পড়তে হবে।
ফিকহে হানাফির প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কিতাব মাবসুতে সারাখসিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত ওমর (রা) জামাতে তারাবি আদায়ের সময় খতম তারাবি পড়ানোর প্রতি জোর দিতেন। সে অনুযায়ীই তা পড়ানো হতো।
তবে কিছু কিছু আলেমের মতে, খতম তারাবি পড়ার চেয়ে ধীরেসুস্থে মাখরাজ ও তাজবিদ সহকারে সূরা তারাবি পড়াই উত্তম।
তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল?
অনেক আলেমের মতে, তারাবির নামাজ শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদতগুলোর একটি। তাদের ভাষায়, এটি আবশ্যক না হলেও, আদায়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে সওয়াব অর্জিত হয়ে থাকে।
তবে অধিকাংশ আলেম মনে করেন, তারাবির নামাজ মূলত সুন্নতে মুয়াক্কাদা। অর্থাৎ না পড়লে তা সিয়াম সাধনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু ঘটবে না। তবে যেহেতু মহানবি (সা) ও সাহাবিগণ এটি আদায় করতেন নিয়মিত, তাই রমজানে এটি নিয়মিত আদায় করা উত্তম।
তারাবির নামাজ না পড়লে রোজা হবে?
তারাবির নামাজ না পড়লে রোজা হবে কি-না, তা নিয়ে অনেকের মাঝে সংশয় কাজ করে থাকে।
তবে ইসলামি স্কলারদের মতে, তারাবির নামাজ ও রোজা পৃথক দুটি ইবাদত। তাই একটির সাপেক্ষে অপরটির কোনো মূল্যায়ন সঠিক নয়। তা ছাড়া, রমজানে রোজা রাখা ফরজ হলেও তারাবির নামাজ পড়া সুন্নত। ফলে তারাবির নামাজ না পড়লেও রোজা হবে।
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য তারাবির নামাজের বিধান
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই রমজানে তারাবির নামাজ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলিমকে রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়তে হবে।
তবে বুখারি শরিফের ২০১২ নম্বর হাদিসে পুরুষদের মসজিদে তারাবির নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে জরুরি প্রয়োজনে একাকী আদায় করলেও ক্ষতি নেই।

