সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান–কে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্ক জোরালো হয়েছে।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর এই সিদ্ধান্তে দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশ যেমন বিস্মিত, তেমনি বিরোধী দলগুলোও নিয়োগটির কড়া সমালোচনা করছে।
বিএনপির কয়েকজন নেতা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন ব্যক্তিকে সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়াটা দলের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছেন।
তাঁদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও প্রতিবেশী ভারতের মতো শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে একজন পেশাদার ও অভিজ্ঞ কূটনীতিকের প্রয়োজন ছিল। সেই বিবেচনায় ড. খলিলুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে উত্তেজনা, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড. খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং নীতিগত আলোচনায় অভিজ্ঞ — এই যোগ্যতাই তাঁর নিয়োগের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
অন্য দিকে, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ মহলেও নিয়োগটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় আঠারো মাসে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা ছিল — এ বিষয়টি তাঁরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নিয়োগের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রকাশ্য মন্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছেন।
ড. খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলাসহ নানা ইস্যুতে চাপে পড়ে। একই সময়ে বিএনপিও নির্বাচনের দিনক্ষণ চেয়ে আন্দোলনের হুমকি দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর সঙ্গে বৈঠক করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে ড. খলিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় থেকেই বিএনপির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আরও দৃঢ় হয়। এ ছাড়া ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ড. খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনকালে নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বিএনপির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন—এমন একটি ধারণা দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এই আস্থাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পথে এগিয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগ শুধু ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রশ্ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা। পরাশক্তিদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন সরকার কতটা সফল কূটনীতি গড়ে তুলতে পারে, সেই পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধেই।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
#আরএ

