সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন ইসলামি মাহফিল ও বয়ানে হঠাৎ করে ওয়াহাবি ও সালাফির মতো বিভিন্ন ইসলামের মতবাদ নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেশকিছু সুফি, পীর ও বাউলদের ওপর হামলার মতো ঘটনাতেও রসদ জুগিয়েছে এসব মতবাদের দোলাচল।
কিন্তু আসলে এই ওয়াহাবি বা সালাফি কারা? কেন এসব নিয়ে নতুন করে এত আলোচনা হচ্ছে সম্প্রতি, তা নিয়ে কমতি নেই মানুষের কৌতূহলের। এই পরিস্থিতিতে সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই ইস্যুটির নানা দিক নিয়ে এখানে আলোকপাত করা হলো।
আসলে ওয়াহাবি কারা
ইসলামি গবেষক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্মের যে মূল ধারাগুলো বিরাজমান, তাদের একটি হলো ওয়াহাবি। মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীতে সৌদি আরবের মক্কায় আব্দুল ওয়াহাব নজদি এই ধারার প্রচলন করেন।
ওয়াহাবি ইসলামি ধারা মোতাবেক, ইসলামে সকল ধরনের রহস্যময়তা, সুফিবাদ নিষিদ্ধ। এ ধারায় বিশ্বাসীরা মনে করেন মাজার তথা সমাধিসৌধ নির্মাণও বৈধ নয়। এ কারণে কয়েক বছর পরপর সৌদি আরবে পুরোনো সমাধিফলকসমূহ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার রেওয়াজও চোখে পড়ে।
মোটকথা, কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি দায়বদ্ধতাই এই মতবাদের অনুসারীদের প্রেরণার উৎস।
সালাফি কারা
ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলো সালাফিবাদ। এ মতের অনুসারীরা মূলত আহলে হাদিস হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকেন। মিশরের দার্শনিক মুহাম্মদ আব্দুহ এই মতবাদের গোড়াপত্তন ঘটান।
এই ধারার অনুসারীরা মনে করেন, ইসলামের সকল বিধিবিধান মেনে চলার জন্য সাহাবি, তাবেঈন (সাহাবিদের শিষ্য) এবং তাবে-তাবেঈনদের (তাবেঈনদের শিষ্য) আদর্শই হলো উত্তম মানদণ্ড। সালাফিবাদীরাও ওয়াহাবিদের মতো কঠোর ধর্মীয় রীতি-নীতির অনুসরণে জোর দিয়ে থাকলেও, কবর পূজা কিংবা মাজার ইস্যুতে তাদের তেমন দৃঢ় বিরোধিতার দৃশ্য কোথাও লক্ষণীয় নয়।
বাংলাদেশে কোন ধারার প্রচলন বেশি
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, গবেষক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের ভাষায় বাংলাদেশে ইসলামের ওয়াহাবি, সালাফি ও সুফী ধারার একটি মিশ্র রূপ আবহমান কাল ধরে বিরাজ করে আসছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াহাবি ও সালাফি মতধারায় বিশ্বাসীদের বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ দেশেও তা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। অথচ বাংলাদেশে মূলত সুফীদের মাধ্যমে ইসলামের বিকাশ ঘটেছে ঐতিহাসিকভাবে।
‘ইসলামিস্ট মিলিট্যান্সি ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থের রচয়িতা শাফী মো. মোস্তফার দাবি, মূলত সুফীদের হাত ধরে বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটলেও, স্থানীয় মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের মতবাদের বেশ মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে।
তবে সালাফি ও ওয়াহাবি ধারার অনুসারীদের মাঝে সবসসময়ই নিজেদের মূল্যবোধে অটল থাকার প্রবণতা বিদ্যমান। এ কারণেই সাম্প্রদায়িক কালে নানা ঘটছে বলে মত তাঁর।
ওয়াহাবি-সালাফিদের নিয়ে কেন আলোচনা
বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শুরু থেকেই ওয়াহাবিবাদে বিশ্বাসীদের একটি পোক্ত অবস্থান রয়েছে। সুফীবাদীদের মাধ্যমে এ দেশে ইসলামের বীজ রোপিত হলেও, ওয়াহাবিরা অঞ্চলটির বহু আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে।
বিশেষ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন কিংবা ওয়াহাবি আন্দোলনের মতো সংগ্রামগুলোতে সম্পৃক্ত হাজী শরিয়তুল্লাহ ও মীর নিসার আলী তিতুমীরের মতো ব্যক্তিরা ছিলেন সরাসরি ওয়াহাবিবাদে বিশ্বাসী।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ওয়াহাবিরা মাজার ইস্যু নিয়ে সক্রিয় হয়েছেন বলে মনে করে থাকেন অনেকে। তবে বাস্তবে সকল ঘটনার পেছনে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানার থাকায় কাউকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয় প্রশাসনের পক্ষে।
আবার, সালাফিবাদীরাও কট্টর অবস্থানে বিশ্বাসী। এ কারণে তাদের মাঝে সালাফি জিহাদিবাদের প্রসারও ঘটেছে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। বহু তাত্ত্বিক তাই মাজার ইস্যুতে সালাফিদের একাংশের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা। তবে এটিরও সরাসরি সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুপস্থিত।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশে যে ধারার ইসলামি ভাবধারার প্রচলন বিদ্যমান, তা হলো একটি মিশ্রিত রূপ। সুফী, সালাফি, ওয়াহাবিদেরর সঙ্গে সঙ্গে হানাফি মাযহাবের সংখ্যাও কম নয় এ দেশে। বরং বহু গবেষকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুসলিমদের অধিকাংশই হানাফি মাযহাবের অনুসারী।
এরপরও সাম্প্রতিক সময়ে যে বিভেদ চোখে পড়ছে, তা থেকে দেশ ও দশের কল্যাণের স্বার্থে সতর্ক থাকা জরুরি। একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বিভেদের পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধতাই হওয়া উচিত একমাত্র পথ।

