বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক রক্তাভ দিনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো ২১ ফেব্রুয়ারি। বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানে (অধুনা বাংলাদেশে) রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায্য নীতির বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের এ দিন ফুঁসে ওঠে গোটা বাঙালি জনপদ। তরুণেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে সমুন্নত করেন মায়ের ভাষার মর্যাদা।
এই আন্দোলনের পরিক্রমায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি দুঃশাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গঠিত এই দেশ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর সাক্ষী হয়েছে আরও একটি উত্তাল মুহূর্তের। স্বাধীন দেশের বুকে জেঁকে বসা তুমুল স্বেচ্ছাচারিতা, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
তারই পরিপ্রেক্ষিতে, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পর এসে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগছে — ’৫২, ’৭১ ও ’২৪-এর আন্দোলন ও সংগ্রামের নেপথ্য প্রেরণার উৎসমূল প্রকৃতপক্ষে কী? এই ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কই-বা কোথায়? দেশের নানা প্রান্তের কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খোঁজা হয়েছে এখানে।
মানুষের ঐক্যবদ্ধ এবং নির্ভীক পথচলার তাড়না
দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় শিল্পনগরী খুলনা। শহরটির স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী তামান্না শিরিন। শিরিনের ভাষায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের গণমানুষকে শিখিয়েছে মাতৃভাষা ও পরিচয় রক্ষার সাহস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ জুগিয়েছে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন পূরণের অদম্য শক্তি। আর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তরুণদের ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে আরও সচেতন করেছে।
তাঁর মতে, অধিকার ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে “মানুষের ঐক্যবদ্ধ এবং নির্ভীক পথচলার তাড়না” থেকেই ’৫২, ’৭১ ও ’২৪-এর সংগ্রামের প্রকৃত প্রেরণা উৎসারিত হয়েছে।
’৫২, ’৭১ ও ’২৪ একই ধারার গল্প
ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন খোন্দকার রিয়াসাত ইসলাম অমিয়। অমিয় মনে করেন, ’৫২, ’৭১ আর ’২৪ একই ধারার গল্প ব্যতীত আর কিছুই নয়। তিনি বলেন, যখনই এই “দেশের মানুষের ভাষা, অধিকার বা ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই সাধারণ মানুষ ভয় না পেয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।”
অমিয়ের ভাষ্য, ’৫২-তে ভাষার জন্য, ’৭১-এ স্বাধীনতার জন্য, আর ’২৪-এ নিজের অধিকার ও সম্মানের জন্য মানুষ রাস্তায় নেমেছে। প্রজন্মের বদল এবং একইসঙ্গে সময়ের পরিবর্তন অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার সাহসকেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চেতনা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধিকার, ক্ষমতায়ন ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য সোপান
দেশের উত্তরাংশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত হয়ে ওঠে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সামিহা ফেরদৌসী। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থীর ধারণা, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাঙালির ভাষার অধিকারের প্রশ্নে আপসহীনতা, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল্য এবং ’২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের দৃপ্ত সংগ্রামের কথা মনে করায় আমাদের।
সামিহা দাবি করেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ’৫২, ’৭১ ও ’২৪-এর মিলিত চেতনা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে “জনগণের অধিকার, ক্ষমতায়ন ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য সোপান” হিসেবে গড়ে উঠেছে। তাঁর মতে, এই তিনটি আন্দোলনের ভিত্তিমূল হলো অধিকার, স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। আদতে, ভাষার মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় বিকাশ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার বহুলাকাঙ্ক্ষিত সংগ্রামের বহমান ধারা হিসেবে ’৫২, ’৭১ ও ’২৪-এর আন্দোলনকে চিহ্নিত করেন তিনি।
“ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ” বিনির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধতা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে দেশে “বাংলাদেশপন্থী” সকল ধরনের আধিপত্যবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন জারি রাখতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার গণমাধ্যম ও প্রচার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন মো. নিয়াজ মাখদুম।
টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ-কে নিয়াজ মাখদুম বলেন, ’৫২, ’৭১ ও ’২৪ একই সুতোয় গাঁথা এক ধারাবাহিক চেতনার স্বরূপ। তাঁর ভাষায়, ’৫২ আমাদের অধিকার আদায়ের যাত্রা শুরু করেছিল। ’৭১ সেই যাত্রাকে আত্মত্যাগের মহীরূহে রূপ দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় ’২৪ সেই আত্মত্যাগের আদর্শকে সমকালীন বাস্তবতায় পুনর্জাগরিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় — এই জনপদের মানুষ অন্যায়ের সামনে কখনো দীর্ঘদিন মাথা নত করে থাকেনি। প্রয়োজন হলে তারা জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু জুলুম ও অবিচারের সঙ্গে আপস করেনি। সচেতন প্রতিরোধ, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠন এবং নাগরিক মর্যাদা রক্ষাই এ জাতির ঐতিহ্য হওয়ায় এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
নিয়াজের মতে, ’৫২, ’৭১ ও ’২৪ কেবল তিনটি সাল নয়। এগুলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবিচল থাকার প্রতি বাংলাদেশিদের অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার দৃষ্টান্ত।
অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক চেতনায় অদম্য স্পৃহার প্রতিফলন
দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন সাঈদুর জামান বাপ্পি। ’৫২, ’৭১ ও ’২৪-এর আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে বাপ্পি বলেন, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র, আর ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবির প্রতিধ্বনি। এই তিনটি ধারাই একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক চেতনায় অটল জনতার অদম্য স্পৃহার প্রতিফলন হিসেবে ১৯৫২ আমাদের শিখিয়েছে ‘আমি কে’, ১৯৭১ দিয়েছে ‘স্বাধীনতা কী’, আর ২০২৪ মনে করিয়ে দিয়েছে ‘স্বাধীনতা মানে জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র’।
অধিকার সংগ্রামকে সুসংহত করার ধারাবাহিক চেতনা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে (সিপিডি) রিসার্চ প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেছেন সাইফুদ্দীন খালেদ। বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত সাইফুদ্দীন সামগ্রিকভাবে ’৫২, ’৭১ ও ’২৪-এর বিষয়ে বলেন, ভাষা আন্দোলন বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার সংগ্রামকে জাগ্রত করেছে। তারই পরিক্রমায় মুক্তিযুদ্ধ সেই চেতনাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃঢ়তায় রূপ দেয়। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীন রাষ্ট্রে ন্যায়, সমঅধিকার ও জবাবদিহিতার দাবিকে নতুন করে উচ্চারণ করে।
সাইফুদ্দীনের ভাষায়, এই তিনটি অধ্যায়ের নেপথ্যে রয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অধিকার সচেতনতা, তরুণ সমাজের নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগের ঐতিহ্য। তিনি বলেন, বাংলার জনপদকে ’৫২ শিখিয়েছে পরিচয়ের প্রশ্নে আপস নয়, ’৭১ শিখিয়েছে স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার, আর ’২৪ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহিতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃতপক্ষে, এ জনপদের মানুষের অধিকার সংগ্রামকে সুসংহতকরণে ’৫২, ’৭১ ও ’২৪ একই ধারাবাহিক চেতনার বিবর্তিত রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
#আরএ

