আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ ভঙ্গের অভিযোগ ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে একুশে উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর স্বার্থেই নির্ধারিত প্রোটোকলে সাময়িক পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর কয়েক মিনিট পর, রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর তাঁর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃবৃন্দ এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ডা. জোবায়দা রহমান ও জাইমা রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পরবর্তীতে একযোগে তিন বাহিনীর প্রধান — সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন — তাদের বাহিনীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান।
পরে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান-এর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের নেতারা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং মোনাজাতে অংশ নেন।
এ সময় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। পরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা, নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তবে এই শ্রদ্ধা নিবেদনের ক্রম নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে বেশ। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, মন্ত্রিসভার সদস্য ও দলীয় নেতারা আগে শ্রদ্ধা জানান।
উল্লেখ্য, নতুন সরকারের সংসদ স্পিকার এখনো নির্ধারিত না হওয়ায় বিষয়টি আরও জটিলতা তৈরি করে। এ বিষয়ে একুশে উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ খোলাসা করেন।
তিনি জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত বছর রাষ্ট্রীয় অতিথিরা চলে যাওয়ার পর হঠাৎ অতিরিক্ত মানুষের প্রবেশে বিদেশি কূটনীতিক ও তিন বাহিনীর প্রধানদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকেই এ বছর আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের দ্রুত বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
সাইফুদ্দিন আহমদ আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি আগেই জানিয়েছিলেন যে তিনি রাতে আসবেন না এবং ভোরে শ্রদ্ধা জানাবেন। ফলে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এ অবস্থায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতেই নির্ধারিত সূচিতে সাময়িক রদবদল করা হয়। তবে অফিসিয়াল তালিকায় বিরোধী দলীয় নেতার অবস্থান অপরিবর্তিত ছিল বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স হলো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে পদমর্যাদার ভিত্তিতে ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ধারণের একটি প্রোটোকল তালিকা। ২০২০ সালে সর্বশেষ সংশোধিত এই তালিকা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনী প্রধানদের অবস্থান নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যদিও আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যাই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষের দাবি — এটি ছিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি বাস্তব সিদ্ধান্ত। তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রোটোকল মানা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে এ ঘটনার পর।
#আরএ

