ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যাংকিং কিংবা স্ট্রিমিং সবকিছুর নেপথ্যে কাজ করে ডেটা সেন্টার। সহজভাবে বললে, ডেটা সেন্টার হলো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার সার্ভারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি অবকাঠামো, যেখানে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও আদান–প্রদান হয়।
ব্যবহারকারীর চোখে এটি দৃশ্যমান না হলেও ডিজিটাল অর্থনীতির মূল ভিত্তি এই ডেটা সেন্টারই। ডেটা সেন্টারের ভেতরে থাকে হাজার হাজার সার্ভার, নেটওয়ার্ক ডিভাইস ও স্টোরেজ সিস্টেম। এগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখার জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর কুলিং সিস্টেম।
কারণ সার্ভার চলার সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে পুরো সিস্টেম অচল হয়ে পড়তে পারে।
এখানেই আসে পানির প্রশ্ন। অনেকের ধারণা, ডেটা সেন্টার মানেই বিপুল পানি খরচ। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ডেটা সেন্টারের কুলিং পদ্ধতি একাধিক ধরনের।
প্রচলিত এয়ার কুলিং পদ্ধতিতে মূলত শীতল বাতাস ব্যবহার করা হয়, যেখানে পানির ব্যবহার তুলনামূলক কম বা পরোক্ষ। তবে বড় আকারের বা হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারে পানি-ভিত্তিক কুলিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে।
পানি ব্যবহারের একটি প্রচলিত উপায় হলো ইভাপোরেটিভ কুলিং। এতে পানি বাষ্পীভূত হয়ে তাপ শোষণ করে নেয়, ফলে সার্ভারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলেও পানির ব্যবহার বেড়ে যায়।
বিশেষ করে শুষ্ক ও উষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত ডেটা সেন্টারগুলোতে এই কুলিং বেশি কার্যকর। তবে পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় এটি পরিবেশগত উদ্বেগ তৈরি করে।
অবশ্য সব ডেটা সেন্টার সমানভাবে পানি ব্যবহার করে না। আধুনিক প্রযুক্তিতে লিকুইড কুলিং বা ক্লোজড-লুপ সিস্টেম চালু হয়েছে, যেখানে পানি বা বিশেষ কুল্যান্ট বারবার ঘুরে ব্যবহার করা হয়। এতে পানির অপচয় কমে আসে।
অনেক প্রতিষ্ঠান আবার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহৃত পানি কিংবা সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে কুলিংয়ের কাজে লাগাচ্ছে।
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো পানির ব্যবহার কমাতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। গুগল ও মাইক্রোসফট তাদের ডেটা সেন্টার পরিচালনায় ‘ওয়াটার পজিটিভ’ কৌশলের কথা বলছে, অর্থাৎ তারা যত পানি ব্যবহার করে, তার চেয়েও বেশি পানি পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
অন্য দিকে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস দক্ষ কুলিং ডিজাইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পানির ব্যবহার অপ্টিমাইজ করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে পানির বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। এখানে একদিকে ডিজিটাল সেবা বিস্তারের প্রয়োজন, অন্যদিকে পানিসম্পদের ওপর চাপ।
তাই ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টার পরিকল্পনায় শক্তি দক্ষতার পাশাপাশি পানি দক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিনির্ধারণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং আধুনিক কুলিং প্রযুক্তির সমন্বয় ছাড়া টেকসই ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডেটা সেন্টারের রক্ষণাবেক্ষণে পানি লাগে—এ কথা আংশিক সত্য। তবে কতটা পানি লাগবে, তা নির্ভর করে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, অবস্থান এবং ব্যবস্থাপনার ওপর।
সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে ডেটা সেন্টার যেমন ডিজিটাল অগ্রগতির চালিকাশক্তি হতে পারে, তেমনি পরিবেশের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
#আরএ

