যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর গাজা উপত্যকায় ধীরে ধীরে ফিরছে মানুষের চলাচল। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির পাশাপাশি কৃষকেরা ফিরে যাচ্ছেন নিজেদের মাঠে। তবে এই ফেরা স্বস্তির নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুভয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন করে বীজ বোনার এক কঠিন সংগ্রাম।
গাজা সিটির জেইতুন এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আল-স্লাখির জন্য যুদ্ধের পর কৃষিকাজ শুরু করা মানে শুধু জমি প্রস্তুত করা নয়। বরং জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে তার গ্রিনহাউস, সেচব্যবস্থা ও ফসলি জমি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ভাঙা কাঠামো সরিয়ে সীমিত যন্ত্রপাতি আর পরিবারের শ্রমে তিনি আবার সবজি চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু মাঠে নামার প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তায় ভরা।
তার খামারটি ইসরায়েল ঘোষিত তথাকথিত নিরাপত্তা ‘বাফার জোন’-এর খুব কাছাকাছি। কয়েকশ মিটার দূরেই ইসরায়েলি ট্যাংকের অবস্থান। মাঝেমধ্যেই গুলির শব্দ ভেসে আসে। সম্প্রতি জমিতে কাজ করার সময় কাছাকাছি এলাকায় ট্যাংক থেকে গুলি ছোড়া হলে প্রাণ বাঁচাতে তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে হয়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ শতাংশেরও কম জমি পুরোপুরি চাষের উপযোগী রয়েছে। যুদ্ধের পাশাপাশি এই বাস্তবতা গাজার খাদ্য নিরাপত্তাকে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
ইসরায়েল বর্তমানে গাজা উপত্যকার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যাকে তারা বাফার জোন হিসেবে উল্লেখ করছে। এই এলাকার বড় অংশই একসময় ছিল উর্বর কৃষিজমি।
মোহাম্মদের পরিবার যুদ্ধের আগে ২২ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ করত। এখন তিনি যেতে পারছেন মাত্র এক হেক্টরে। বাকি জমি কার্যত নিষিদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
একই চিত্র দেইর আল-বালাহ এলাকার প্রবীণ কৃষক ঈদ আল-তাবানের ক্ষেত্রেও। হলুদ চিহ্নিত সীমারেখা থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে তার জমি। যুদ্ধবিরতির পর তিনি বেগুন ও টমেটো চাষ শুরু করলেও নিয়মিত জমিতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন ভারী অস্ত্রের শব্দ শোনেন তিনি। তার ছেলেরা সেচ দিতে গেলে তিনি উৎকণ্ঠায় থাকেন — তারা নিরাপদে ফিরবে তো?
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানায়, পূর্ব দেইর আল-বালাহে জমিতে কাজ করার সময় কৃষক খালেদ বারাকাকে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। তিনি ছিলেন ঈদ আল-তাবানের প্রতিবেশী ও দীর্ঘদিনের সহকর্মী।
ঈদের ভাষায়, খালেদ শুধু একজন কৃষক ছিলেন না। কৃষিকাজকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে দেওয়াই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য।
চাষাবাদের আরেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলি অবরোধ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচযন্ত্র ও কৃষিযন্ত্র গাজায় প্রবেশ কার্যত বন্ধ। যেসব উপকরণ আগে মজুত ছিল, সেগুলোর অনেকটাই মেয়াদোত্তীর্ণ বা বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত।
এ ছাড়া, সীমিত সরবরাহের কারণে দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। উচ্চমূল্যে কেনা অনেক সার ও কীটনাশক কার্যকর না হওয়ায় পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাজারেও স্বস্তি নেই। কখনো সীমান্ত বন্ধ, আবার কখনো বাইরের পণ্য ঢুকে পড়ায় স্থানীয় কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।
পাইকারি বিক্রেতারা জানান, ইসরায়েলি পণ্যের দাম কম হওয়ায় স্থানীয় ফসল বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ফসল বিক্রি করা অথবা পচে যেতে দেওয়া — এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা।
সব ক্ষতি আর ঝুঁকির পরও জমি ছাড়তে নারাজ গাজার কৃষকেরা। তাদের কাছে কৃষিকাজ শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি পরিচয়, স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের অংশ।
ঈদ আল-তাবানের কথায়, “আমার দাদা ১৯৪৮ সালের আগে বীরশেবায় কৃষক ছিলেন। সেই ভালোবাসা আমাদের রক্তে। জমি থেকে আমাদের আলাদা করা যাবে না।”
ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে এই কৃষকেরাই এখন গাজার জীবনের সবচেয়ে নীরব কিন্তু শক্ত প্রতিরোধের নাম।
#আরএ

