কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, ইটনা ও নিকলী — এই চারটি উপজেলা মিলিয়ে দেশের বিখ্যাত হাওরাঞ্চল গড়ে উঠেছে। বর্ষাকালে পানির তলায় বিলীন হয়ে যাওয়া বিশাল এই সমতল সৌন্দর্যকে এখন সহজেই ঘুরে দেখা যায় এক অনন্য রাস্তার মাধ্যমে, যা স্থানীয়ভাবে হাওর রোড নামে পরিচিত।
এটি মূলত মিঠামইন থেকে অষ্টগ্রাম ও ইটনা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অল-ওয়েদার রুট। যা বসন্ত থেকে মনসুন, শুকনো মৌসুমেও পর্যটকদের আর্কষণ করছে।
বর্ষার সময়ে যখন পানি পূর্ণতা পায়, তখন হাওরের সৌন্দর্য যেন সমুদ্রসমতার সম্মোহনে ভরা থাকে। শহর থেকে বেরিয়ে এই রোডে ঢুকলেই দুই দিকেই চোখে পড়ে বিশাল জলরাশি, কখনো নির্জন নীল শ্রোণ, আবার কখনো ভেসে ওঠা কিছু দ্বীপাকৃতি জায়গা।
পর্যটকেরা হাওরের এ অপূর্ব রূপ উপভোগ করতে রিজার্ভ নৌকা বা লোকাল নৌকায় করে মিঠামইন বা অষ্টগ্রাম পর্যন্ত আসে। বর্ষাকালে সাবমার্সিবল রাস্তাগুলি ডুবে থাকলেও এর দু’পাশের পানির অপূর্ণ সৌন্দর্যই পর্যটকদের বড় আকর্ষণ।
শুকনো মৌসুমে (আর্থাৎ অক্টোবর থেকে এপ্রিল) পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। তখন পানি নামতে শুরু করে এবং সাবমার্সিবল রাস্তাগুলো আবার মাথা তুলে ওঠে। এই সময় হাওর রোডের দুই পাশে ধানের সবুজ সমভূমি বা ধান পেকে গেলে সোনালি মাঠের ছবি পর্যটকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। গাড়ি নিয়েই এই সময় সহজেই রোড ধরে ঘুরায় ভ্রমণকারীদের জন্যে সুযোগ আরও বৃদ্ধি পায়।
অষ্টগ্রাম হাওর যেভাবে যাবেন
হাওর রোডে যাওয়ার মূল প্ল্যানের দুটি সম্ভাব্য রুট আছে। বর্ষাকালে অনেক ভ্রমণকারী নিকলী হাওর পাড় থেকে নৌকা ধরে মিঠামইন পৌঁছে রোড ধরে অষ্টগ্রাম বা ইটনা পর্যন্ত যায় এবং একই পথে ফিরে আসে। কিশোরগঞ্জ থেকে অষ্টগ্রাম ৬০ কিলোমিটার।
শুষ্ক মৌসুমে কিশোরগঞ্জ সদর থেকে শুরু করে করিমগঞ্জ বালিখোলা ঘাটে এসে ফেরি পার হয়ে মিঠামইনে পৌঁছানো যায় এবং সেখান থেকে রোড ধরে অষ্টগ্রাম বা ইটনা পর্যন্ত ট্যুর করা যায়। ঢাকাদ্দেশ থেকে বাস বা ট্রেনে কিশোরগঞ্জ সদর এসে এরপর সিএনজি বা লোকাল বাহন ভাড়া করে এই ভ্রমণ শুরু করাই জনপ্রিয়। পুরো যাত্রা এবং দর্শনের জন্য সাধারণত ৬-৭ ঘন্টা সময় লাগে।
হাওর রোডের ভ্রমণ শুধু প্রকৃতির দৃশ্যই নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সঙ্গেও পরিচয় করায়। অষ্টগ্রামে রয়েছে প্রায় ৪০০ বছর পুরনো কুতুবশাহ মসজিদ, যা ইতিহাসপ্রেমীদের জন্যে এক গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। মিঠামইনের কামালপুর অঞ্চলে অবস্থিত রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের গ্রামের বাড়িও দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে।
অষ্টগ্রাম হাওর বেড়াতে গিয়ে কি খাবেন?
খাবারের দিকেও হাওর রোডের যাত্রীরা মোটামুটি পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা পায়। অষ্টগ্রাম বা মিঠামইন বাজারে হাওরের তাজা মাছ বিভিন্ন আইটেমে পাওয়া যায়। দেশীয় বিরিয়ানি, মাংস ও স্থানীয় সবজি-ভাজা-ভর্তাসহ এক সময়ের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা সহজেই করা যায়। যেখানে রাত থাকতে চাইলে সরকারি ডাকবাংলো বা বাজেট হোটেলগুলো তুলনায় সাশ্রয়ী, আর যদি একটু আরাম চান তাহলে হাওরপাড়ের রিসোর্টগুলোও বিবেচনা করতে পারেন।
এক কথায়, হাওর রোড কিশোরগঞ্জ — বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন সাজে সাজানো একটি পর্যটন-দিগন্ত। জলরাশি, সবুজ ধানক্ষেত, ইতিহাস ও গ্রামের জীবন— সব মিলিয়ে এখানে যা দেখবেন, তা সহজে ভুলে যাবেন না। তাই আপনার ভ্রমণ তালিকায় হাওর রোডকে একটা বিশেষ স্থান দিন।
#আরএ

