২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এবং ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র নির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তাদের বিস্তারিত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক এই দলিলে রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে ৩৬ দফা অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে।
১. ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক সংস্কার
এনসিপি তাদের ইশতেহারে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় সংঘটিত জুলাই গণহত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। এই লক্ষ্যে তারা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলোর প্রস্তাব দিয়েছে:
- ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন: সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি গঠন করা হবে।
- ‘হিসাব দাও’ পোর্টাল: মন্ত্রী, এমপি এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের বিবরণ এই পোর্টালে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে।
- আমলাতন্ত্রের আধুনিকায়ন: সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি শতভাগ পারফরম্যান্স-ভিত্তিক হবে এবং বিশেষজ্ঞ নিয়োগে ‘ল্যাটারাল এন্ট্রি’ বৃদ্ধি করা হবে।
২. অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ
দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কমিয়ে এনসিপি কর-জিডিপি অনুপাত ১২%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তাদের পরিকল্পনা:
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৬%-এ নামিয়ে আনা এবং ব্যবসায়িক চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে।
- স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড: টিসিবি-র কার্ড ব্যবস্থা ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
- ক্যাশলেস অর্থনীতি: স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দেওয়া হবে।
৩. তারুণ্য ও কর্মসংস্থান
তরুণদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে আনতে এনসিপি এক যুগান্তকারী প্রস্তাব করেছে:
- ভোটাধিকার ১৬ বছরে: ভোটাধিকারের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- এক কোটি কর্মসংস্থান: আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
- উদ্যোক্তা সহায়তা: নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন এবং নতুন এসএমই ব্যবসার জন্য প্রথম ৫ বছর করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে।
৪. বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা
এনসিপি একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। তাদের স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারগুলো হলো:
- বিশেষায়িত স্বাস্থ্য জোন (SHZ): হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে এই জোন স্থাপন করা হবে যাতে বিদেশগামী চিকিৎসা পর্যটন হ্রাস পায়।
- জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সিস্টেম: জরুরি চিকিৎসার জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড অ্যাম্বুলেন্স এবং প্যারামেডিক রেসপন্স টিম গঠন করা হবে।
৫. জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এনসিপি একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রস্তাব করেছে:
- প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন: সেনাবাহিনীতে একটি UAV (ড্রোন) ব্রিগেড গঠন এবং মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে।
- পররাষ্ট্রনীতি: ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে।
৬. নারী অধিকার ও প্রবাসীদের মর্যাদা
- নারীর ক্ষমতায়ন: জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
- প্রবাসীদের জন্য ‘রেমিট মাইলস’ (RemitMiles): রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে প্রবাসীদের বিমান টিকিটে ছাড় ও পেনশন সুবিধা দেওয়া হবে।
এনসিপি জানিয়েছে, এই ৩৬ দফা কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি একটি বাস্তবসম্মত ৫ বছরের পরিকল্পনা, যা ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।

