কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছর ধরেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাবে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চললেও, সাম্প্রতিক সময়ে সেই আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৭ সালের শুরুতেই আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই) বাস্তব রূপ পেতে পারে। এটি কর্মক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা আমূল বদলে দেবে।
বিশ্বব্যাপী বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন মানবসম্পদের পরিবর্তে এআই-নির্ভর ব্যবস্থায় ঝুঁকছে। এর ফলে প্রচলিত অনেক চাকরি সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রশাসনিক ও বিশ্লেষণভিত্তিক কাজে স্বয়ংক্রিয়তা বাড়লে বিপুলসংখ্যক কর্মী চাকরি হারাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিসের চেয়ারম্যান নন্দন নীলেকণি এআইয়ের প্রভাব নিয়ে ভিন্ন এক বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছেন।
বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত ‘এআই ইনভেস্টর ডে ২০২৬’-এ তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে ব্যবসা ও কর্মপ্রবাহ পুনর্গঠন করছে, যা আগের কোনো প্রযুক্তি পারেনি। তাঁর মতে, এআইয়ের কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
নীলেকণির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফ্রন্ট-এন্ড ডেভেলপার, কিউএ টেস্টার, আইটি সাপোর্ট স্পেশালিস্ট কিংবা নির্দিষ্ট ধাঁচের ব্লকচেইন ডেভেলপারদের মতো কাজগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে। তবে একই সঙ্গে এআই-নির্ভর নতুন পেশার ক্ষেত্র তৈরি হবে, যেখানে আগামী দিনে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যুগে পাঁচ ধরনের পেশার চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়বে। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে এআই ইঞ্জিনিয়ার। বড় ডেটা ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করে কাস্টম এআই সিস্টেম তৈরি, পরিচালনা ও তদারকি করাই তাঁদের মূল দায়িত্ব।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পেশা এআই ফরেনসিক অ্যানালিস্ট। এই যুক্ত ব্যক্তিরা সাইবার হামলা, তথ্য ফাঁস ও ডিজিটাল অপরাধ বিশ্লেষণে এআই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
তালিকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পেশা ফরোয়ার্ড-ডেপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার। তাঁরা সরাসরি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে তাদের সিস্টেমকে এআই-নির্ভর করে তোলেন এবং বাস্তব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেন।
পাশাপাশি ‘এজেন্টিক ওয়ার্কফ্লো আর্কিটেক্ট’ নামের নতুন একটি পেশার কথাও উঠে এসেছে, যেখানে সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম এআই এজেন্ট ডিজাইন করা হয়।
শেষতালিকায় রয়েছে ডেটা অ্যানোটেটর। এরা এআই প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল ডেটা সংগঠিত ও প্রস্তুত করেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন অনেকে। লাটভীয় বংশোদ্ভূত কম্পিউটার বিজ্ঞানী রোমান ইয়াম্পোলস্কি দাবি করেছেন, এজিআই চালু হলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাজারের ৯৯ শতাংশ চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। তাঁর মতে, মানুষের চেয়ে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে মেধাভিত্তিক কাজ করতে পারবে এজিআই।
এমন আশঙ্কার কথা শোনা গেছে মাইক্রোসফটের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেমান-এর কাছ থেকেও। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, খুব শিগগিরই আইন, হিসাবরক্ষণসহ বহু ‘হোয়াইট কলার’ পেশায় এআই মানুষের জায়গা দখল করতে পারে।
পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, তরুণদের এআই, ডেটা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে ওঠা জরুরি। কারণ ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
#আরএ

