মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার তীব্রতা বেড়েছে। সরাসরি হামলা শুরু না হলেও এরই মধ্যে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন করে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রশ্ন উঠছে — এই প্রস্তুতির পেছনে এত অর্থ ব্যয়ের কারণ কী, আর শেষ পর্যন্ত কারা লাভবান হচ্ছে?
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক বিমানবাহী রণতরী, অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং হাজার হাজার সেনা সদস্য প্রস্তুত অবস্থায় রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল আর্থিক চাপ। শুধু একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহী রণতরী বহর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৮০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা। অথচ এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হলে এই ব্যয়ের অঙ্ক কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত একেকটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের দামই কয়েক মিলিয়ন ডলার। একদিনের আক্রমণেই খরচ হতে পারে হাজার হাজার কোটি টাকা। ফলে হামলার সিদ্ধান্ত মানে শুধু সামরিক ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিশাল বোঝা বহন করা।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বড় যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় সব সময়ই রেকর্ড ছুঁয়েছে। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধে সরাসরি সামরিক খরচই ছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার।
পরবর্তী চিকিৎসা ব্যয়, পুনর্বাসন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হলে সেই অঙ্ক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়। এত বিপুল অর্থে বিশ্বের বহু দেশের কয়েক দশকের উন্নয়ন বাজেট অনায়াসে মেটানো সম্ভব—এমন মন্তব্য করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে এত ব্যয়ের পরও কেন বারবার যুদ্ধের পথে হাঁটে ওয়াশিংটন? বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ কৌশলগত স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানকার তেল ও গ্যাস সরবরাহ এবং বৈশ্বিক সমুদ্রপথের ওপর প্রভাব বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে রাখতে ইরানকে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপে রাখাও তাদের কৌশলের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
এই যুদ্ধ প্রস্তুতির অর্থ আসছে মূলত সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের করের টাকা থেকে। কিন্তু এর সরাসরি সুফল ভোগ করছে অন্য একটি গোষ্ঠী।
প্রতিরক্ষা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহকারী বড় করপোরেশনগুলো। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার ব্যবস্থার নতুন অর্ডারে এসব কোম্পানির মুনাফা দ্রুত বাড়ে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। এতে লাভবান হয় বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোও। ফলে যুদ্ধ বা যুদ্ধের প্রস্তুতি এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক চক্র’ তৈরি করে, যেখানে সামরিক ও জ্বালানি খাতের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো সুবিধা পায়।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি শুধু কৌশলগত নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলছে। হামলা হোক বা না হোক, প্রতিদিন যে মিলিয়ন ডলার ‘পুড়ছে’, তার ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই — এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
#আরএ

