ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার শান্ত সবুজ পরিবেশে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, কী সেটা? উত্তর, খেলারাম দাতার বাড়ি।
সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি ইতিহাস, লোককথা এবং স্থাপত্যের এক অনন্য সাক্ষী হিসেবে বিরাজমান। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি পুরোনো ধ্বংসাবশেষ নয়; বরং অতীতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
ধারণা করা হয়, খেলারাম দাতা ছিলেন স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি, যিনি দানশীলতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর নাম থেকেই এই স্থাপনার নামকরণ হয়।
মধ্যযুগীয় সময়কালে নির্মিত এই বাড়িটি একসময় ছিল বসতবাড়ি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, মোটা দেয়াল এবং বড় আকারের ইটের নির্মাণশৈলী দেখে বোঝা যায় যে স্থাপনাটি সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকর্ম ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে খেলারাম দাতার বাড়ি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে পাওয়া গেছে প্রাচীন ইটের তৈরি প্রাচীর, ধ্বংসপ্রাপ্ত কক্ষের ভিত্তি এবং পুরোনো স্থাপনার অবশিষ্টাংশ। এসব ধ্বংসাবশেষ মধ্যযুগীয় বাংলার নির্মাণশৈলীর একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
বাড়িটির গঠনশৈলীতে আঙিনাকেন্দ্রিক নকশা এবং শক্তিশালী ইটের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, যা সেই সময়ের বসতবাড়ি নির্মাণের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল।
স্থানীয় লোককথায় খেলারাম দাতাকে ঘিরে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করতেন।
আবার অনেকের মতে, এই বাড়ি একসময় স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটির অনেক অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও এখনো যে অংশগুলো টিকে আছে, তা অতীতের ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে।
বর্তমানে খেলারাম দাতার বাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। চারপাশে সবুজ প্রকৃতি এবং নিরিবিলি পরিবেশের কারণে এটি ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও এখানকার স্থাপত্যের সৌন্দর্য এবং ইতিহাসের আবহ সহজেই অনুভব করা যায়।
কিভাবে যাবেন
খেলারাম দাতার বাড়ি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা শহর থেকে গাবতলী বা মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে নবাবগঞ্জগামী বাসে ওঠা যায়। নবাবগঞ্জ পৌঁছে স্থানীয় অটোরিকশা, ইজিবাইক বা ভ্যানে করে প্রত্নস্থলে যাওয়া সম্ভব।
এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকা-নবাবগঞ্জ সড়ক ব্যবহার করেও সহজে পৌঁছানো যায়।
যা দেখবেন
খেলারাম দাতার বাড়ির মূল আকর্ষণ হলো প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। বড় আকারের ইটের দেয়াল, ভাঙা স্থাপনার ভিত্তি এবং বিস্তৃত প্রাঙ্গণ দর্শনার্থীদের কাছে অতীতের নির্মাণশৈলীর একটি ধারণা দেয়।
আশপাশের সবুজ প্রকৃতি ও গ্রামীণ পরিবেশ জায়গাটিকে আরও মনোরম করে তুলেছে। কাছাকাছি এলাকায় গেলে নবাবগঞ্জের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানও ঘুরে দেখা যায়।
কোথায় খাবেন
প্রত্নস্থলের আশপাশে বড় রেস্টুরেন্ট নেই। তবে নবাবগঞ্জ বাজার এলাকায় স্থানীয় হোটেল ও খাবারের দোকান পাওয়া যায়। সেখানে ভাত, মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন দেশি খাবার পাওয়া যায়।
এছাড়া ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই ঢাকা শহরে ফিরে গিয়েও খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন।
কোথায় থাকবেন
নবাবগঞ্জ এলাকায় বড় মানের আবাসিক হোটেল খুব বেশি নেই। থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প ঢাকা শহর। গাবতলী, ধানমন্ডি বা মোহাম্মদপুর এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল পাওয়া যায়, যেখান থেকে সহজেই নবাবগঞ্জে যাতায়াত করা সম্ভব।
খেলারাম দাতার বাড়ি ঢাকার আশপাশে অবস্থিত প্রাচীন ইতিহাসের একটি নীরব সাক্ষী। ধ্বংসাবশেষের ভেতরেও এখানে লুকিয়ে আছে অতীতের স্থাপত্য, লোককথা এবং সময়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

