জলপথের রণাঙ্গণে রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক উভয় ধরনের কৌশল হিসেবে সামুদ্রিক মাইনের ব্যবহার ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ নিজস্ব জলসীমায় অযাচিতভাবে প্রবেশকৃত জলযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে প্রতিপক্ষের নৌ-সম্পদকে বিধ্বস্ত করতে পারে সহজেই।
এই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে ইরান গোপনে সামুদ্রিক মাইন বসিয়েছে বলে গুঞ্জন উঠছে। এতে করে গোটা বিশ্বের জন্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় অনড় রয়েছে দেশটি।
হরমুজ প্রণালীতে কোন মাইন ব্যবহার করছে ইরান?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও সমরবিদেরা এখনও নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি — ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং শত্রুকে নাস্তানাবুদ করতে মাইন ব্যবহার করছে। তবে তাদের ধারণা, ইরান নিজেদের উৎপাদিত ১০টি মাহাম-১ মাইন প্রণালীটির তলদেশে কার্যকর করে রেখেছে।
মার্কিন সমরবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালীর তলদেশে কার্যকর এই মাইন তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করা যে কোনো জলযানকে দৃঢ়ভাবে আঘাত করতে সক্ষম।
মাহাম-১ মাইন যেভাবে কাজ করে
মাহাম-১ মাইন মূলত ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি বিশেষ ধরনের সামুদ্রিক মাইন, যা জলপথে নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে ব্যবহার করা হয়। জলের স্তরের ১-৩ মিটারের মধ্যে এটি তুমুলভাবে কার্যকর। সাধারণত এর লাইফটাইম ৩ থেকে ২৭০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
মাইনটির একটি বিশেষ প্রি-সেটার অপশন রয়েছে, যাতে স্থাপন এবং নিষ্ক্রিয় করার সময়ের তথ্য ইনপুট দেওয়া যায়। শুধু একবারই এসব তথ্য প্রদান করার সুযোগ থাকে এতে।
মাহাম-১ মাইনের বেশকিছু উপশ্রেণিও রয়েছে। ইরান সরকারের সমরাস্ত্র সংক্রান্ত তথ্য কণিকা মোতাবেক, মাহাম-০১, মাহাম-০২, মাহাম-০২এ২ ও মাহাম-০২বি উপশ্রেণির মাইনগুলো সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এদের সবগুলোই ভাসমান অবস্থায় সর্বোচ্চ ৫ মিটার এবং ডুবন্ত অবস্থায় ৩-১০০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। তবে মাহাম-০১ ডুবন্ত অবস্থায় ১০-৫০ মিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে ব্যবহৃত হয় বেশি।
মাহাম-০১ মাত্র ২০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক ব্যবহার করলেও অন্যান্য শ্রেণির মাইনগুলো ১২০ কেজি পর্যন্ত ওজনের বিস্ফোরক ধারণে সক্ষম। এদের অধিকাংশতেই টিএনটি ব্যবহৃত হলেও মাহাম-০২এ২-তে বি কম্পোজিশন বিস্ফোরক থাকে। সবগুলোতেই পাঁচটি করে হর্ন বা নিক্ষেপক বিদ্যমান।
কার্যকারিতা ও প্রভাব
সমগ্র বিশ্বের তেল ও পণ্য পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই পথকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিবদমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরান যারপরনাই মরিয়া হয়ে আছে।
এ দিকে, স্ট্রস সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ল এর প্রতিবেদন মোতাবেক, ১৯৫০ সাল থেকে অদ্যাবধি ৭৭ শতাংশ মার্কিন জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে সামুদ্রিক মাইন। পাশাপাশি, এর উৎপাদন ব্যয়ও নিম্ন হওয়ায় ইরানের জন্য শাপে বর হয়ে উঠছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, একটি মাইনের পেছনে গড়ে মাত্র দেড় হাজার মার্কিন ডলার খরচের প্রয়োজন পড়ে।
তবে ইরানের নিজেরও ঝুঁকি কম নেই এটির ব্যবহারে। কেননা, খোদ ইরানই ৮০% উৎপাদিত তেল রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে থাকে। সে ক্ষেত্রে, দেশটির নিজেরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সার্বিকভাবে, ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালীতে মাইন ব্যবহার সামরিক কৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি অঞ্চলটি দিয়ে পণ্য ও তেল সরবরাহ চেইনের জন্য বড় ধরনের হুমকি বলেই বিবেচিত হচ্ছে। চলমান সংঘাত শেষের পর অকার্যকর ও অবিস্ফোরিত মাইন থেকেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও রয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সময়ই বলে দেবে এই বিধ্বংসী মাইনের ব্যবহারে কারা প্রকৃত লাভবান হচ্ছে।

