নজরুল ইসলাম, যশোর প্রতিনিধি | বেনাপোল সীমান্তের কোলঘেঁষে ভারতের যে গ্রামটি অবস্থিত, তার নাম ‘তেরোঘর’। বাংলাদেশের গাতীপাড়া ও দৌলতপুর গ্রামের মাঝখানে ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত এই জনপদটি আদতে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক টুকরো ভূমি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একে বলা হয় ‘বাংলাদেশের পেটের ভেতর ভারত’।
বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জনপদটি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনদিকে বাংলাদেশ আর একদিকে ইছামতী নদী—এমন অবস্থানে থেকে তেরোঘরের বাসিন্দা পরিতোষ বা কালি হালদাররা মিশে গেছেন বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে। তাদের চালচলন ও জীবনযাত্রায় এ দেশের প্রভাব স্পষ্ট। তবে সময়ের ব্যবধানে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হওয়ায় এখন আগের মতো আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার সুযোগ নেই।
তেরোঘরের গৃহবধূ আরতি, লক্ষ্মী ও শেফালীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এক অন্যরকম সখ্যতার গল্প। তারা বলেন, “এক সময় আমাদের দিন কাটত দৌলতপুর আর গাতীপাড়ার গৃহবধূদের সঙ্গে। আন্তর্জাতিক সীমানা কী, তা আমরা বুঝতাম না। দুই দেশের বাড়িগুলোর দূরত্ব বড়জোর ৫০ গজ। এপারের রান্নার ঘ্রাণ ওপারে যেত, তরকারি আদান-প্রদান হতো। এখন সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা থাকায় সেই আত্মীয়তায় ভাটা পড়েছে।”
শেফালী আরও জানান, এক সময় তাদের গরু-ছাগল বাংলাদেশের মাঠেই চরতো, জ্বালানি ও ফলমূলও সংগ্রহ করতেন এ দেশের গাছ থেকে। তেরোঘরের শিশুরাও বাংলাদেশের শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হতো। তাদের কাছে এই বিভাজন রেখা ছিল অর্থহীন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার পেট্রাপোল মৌজায় অবস্থিত এই তেরোঘরের আয়তন মাত্র ৫ একর। এখানে বসবাসকারী সাতটি পরিবারের প্রায় ৬০ জন সদস্যের সবাই দরিদ্র এবং পেশায় মৎস্যজীবী বা কৃষক। ভারতের মূল ভূখণ্ডে যেতে হলে তাদের ইছামতী নদী পার হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা ভারত সরকারের সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ বা স্বাস্থ্যসেবার মতো নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। হাতের কাছে বাংলাদেশের ওষুধ থাকলেও তা সংগ্রহ করা তাদের জন্য আইনত নিষিদ্ধ।
বাসিন্দা তারক হালদার আক্ষেপ করে বলেন, “বছরের পর বছর এখানে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। ভোটের সময় ছাড়া কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না।” অতুল হালদারের মতে, “ইছামতী নদী আমাদের ভাগ্যকে দ্বি-খণ্ডিত করেছে।” আর প্রবীণ আরতি রানী জানান, দেশভাগের সময় এখানে ১৩টি পরিবার ছিল বলে নাম হয়েছিল তেরোঘর; এখন আছে মাত্র সাতটি।
তবে ভিন্ন সুরও শোনা যায় স্থানীয় কিছু মানুষের কণ্ঠে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৌলতপুর ও গাতীপাড়া সীমান্তের কয়েকজন জানান, তেরোঘরের অনেক বাসিন্দা ভারতের মূল ভূখণ্ডে বাড়ি করে চলে গেছেন। আর যারা এখানে আছেন, তাদের কেউ কেউ সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্তের এই অদ্ভূত মানচিত্র তেরোঘরের মানুষের জীবনকে একদিকে যেমন বৈচিত্র্যময় করেছে, অন্যদিকে করে তুলেছে অভাব আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা এক বিচ্ছিন্ন জনপদ।
টেলিগ্রাফ/এমউই

