টেলিগ্রাফ রিপোর্ট
| সংস্থা | দেশ | প্রতিষ্ঠা |
| Mossad | ইসরায়েল | ১৯৪৯ |
| CIA | যুক্তরাষ্ট্র | ১৯৪৭ |
| MI6 | যুক্তরাজ্য | ১৯০৯ |
| FSB | রাশিয়া | ১৯৯৫ |
| RAW | ভারত | ১৯৬৮ |
| MSS | চীন | ১৯৮৩ |
| ISI | পাকিস্তান | ১৯৪৮ |
| BND | জার্মানি | ১৯৫৬ |
| DGSE | ফ্রান্স | ১৯৮২ |
| ASIS | অস্ট্রেলিয়া | ১৯৫২ |
গোয়েন্দা সংস্থা কোনো দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা স্তম্ভ (First Line of Defense)। যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার আক্রমণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা কূটনৈতিক সংকট- সবকিছুর আগাম বার্তা আসে এই সংস্থাগুলোর হাত ধরেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পেছনে যেসব সংস্থা নীরবে কাজ করে, তাদের নাম খুব কমই প্রকাশ্যে আসে। অথচ একটি দেশের নিরাপত্তা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সামরিক শক্তির পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বে গোয়েন্দা শক্তিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ১০টি গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা প্রকাশ করা হলো।
১. মোসাদ (MOSSAD) – ইসরায়েল

- পূর্ণ নাম: Institute for Intelligence and Special Operations
- প্রতিষ্ঠা: ১৩ ডিসেম্বর ১৯৪৯
- সদর দপ্তর: তেল আবিব
- নিয়ন্ত্রণ: সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী
মোসাদকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও কার্যকর গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর অপারেশনগুলো এতটাই নিখুঁত ও গোপন যে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব ঘটনাকে সিনেমার গল্প মনে হয়।
প্রধান কার্যক্রম
- বৈদেশিক গোয়েন্দাগিরি
- গুপ্তহত্যা ও কাউন্টার টেররিজম
- ইহুদি নেটওয়ার্ক সুরক্ষা
- শত্রু রাষ্ট্রে গোপন অপারেশন
বিখ্যাত অপারেশন
১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনায় নাৎসি অপরাধী আইখম্যানকে ধরা এবং ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে নেওয়া ‘অপারেশন র্যাথ অফ গড’।
মোসাদের স্পেশাল ইউনিট “কিডন” বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর হত্যাকারী ইউনিট হিসেবে পরিচিত।
বিশেষত্ব: এদের “১১তম ব্যক্তি” নীতি এবং “কিডন” নামক খুনে ইউনিট বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও আতঙ্কিত।
স্লোগান: “পরামর্শের অভাবে জাতি ধ্বংস হয়, কিন্তু অনেক পরামর্শদাতার মাধ্যমে নিরাপত্তা আসে।”
২. সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA) – যুক্তরাষ্ট্র

- প্রতিষ্ঠা: ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭
- সদর দপ্তর: ল্যাংলি, ভার্জিনিয়া
- নিয়ন্ত্রণ: মার্কিন প্রেসিডেন্ট
সিআইএ হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড়, ধনী ও প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা সংস্থা। এর নেটওয়ার্ক পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বিস্তৃত।
বিশেষত্ব: এদের বার্ষিক বাজেট প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। সিআইএ মূলত হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT) এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে কাজ করে।
বিখ্যাত অপারেশন: অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার (ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা), ভিয়েতনামে অপারেশন ফোনিক্স।
প্রধান কার্যক্রম
- বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
- গোপন সামরিক ও রাজনৈতিক অপারেশন
- সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম
- নীতিনির্ধারকদের গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রদান
৩. এমআই৬ (MI6) – যুক্তরাজ্য

- পূর্ণ নাম: Secret Intelligence Service (SIS)
- প্রতিষ্ঠা: ১৯০৯
- সদর দপ্তর: লন্ডন (Vauxhall Cross)
এমআই৬ হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থা। জেমস বন্ড চরিত্রের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
প্রধান কার্যক্রম
- বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
- কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স
- মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ অপারেশন
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
- প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
- স্নায়ুযুদ্ধকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অপারেশন
- আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ও সন্ত্রাসবিরোধী কাজ
বিশেষত্ব: জেমস বন্ড সিরিজের কল্যাণে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এরা মূলত বিদেশের মাটিতে ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।
ঐতিহাসিক সাফল্য: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের ‘এনিগমা কোড’ ভাঙতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
৪. এফএসবি (FSB) – রাশিয়া

- পূর্ণ নাম: Federal Security Service
- প্রতিষ্ঠা: ৩ এপ্রিল ১৯৯৫
- সদর দপ্তর: মস্কো (Lubyanka Square)
এফএসবি হলো কুখ্যাত KGB-এর উত্তরসূরি। এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নিরাপত্তার মূল রক্ষক।
প্রধান কার্যক্রম
- কাউন্টার টেররিজম
- গুপ্তহত্যা ও বর্ডার সিকিউরিটি
- সাইবার ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা
বিশেষ ইউনিট
- Alpha Group
- Vympel Unit
বিশেষত্ব: এর মূল নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে। এদের এজেন্ট সংখ্যা লক্ষাধিক এবং এরা অত্যন্ত কঠোর ও গোপনীয়তার সাথে অপারেশন পরিচালনা করে।
প্রধান কাজ: অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রতি-গোয়েন্দাগিরি এবং বর্ডার গার্ড সার্ভিস।
৫. রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW) – ভারত

- প্রতিষ্ঠা: ১৯৬৮
- সদর দপ্তর: নয়াদিল্লি
- নিয়ন্ত্রণ: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
ভারতের প্রধান বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা RAW দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১)
- কার্গিল যুদ্ধ
- সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্ত নিরাপত্তা
বিশেষত্ব: প্রতিবেশী দেশগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
বিখ্যাত ভূমিকা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তথ্য দিয়ে সহায়তা করা ছিল র-এর অন্যতম সফল অপারেশন।
৬. মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি (MSS) – চীন

- প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৩
- সদর দপ্তর: বেইজিং
MSS বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে গোপনীয় ও বৃহৎ মানব নেটওয়ার্কভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা।
প্রধান কার্যক্রম
- অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত গুপ্তচরবৃত্তি
- সাইবার ইন্টেলিজেন্স
- বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
বিশেষত্ব: এরা মূলত অর্থনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি এবং সাইবার গোয়েন্দাগিরিতে বিশ্বসেরা। পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তিগত গোপন তথ্য সংগ্রহে এদের জুড়ি মেলা ভার।
সদর দপ্তর: বেইজিং।
৭. ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ISI) – পাকিস্তান

- প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৮
- সদর দপ্তর: ইসলামাবাদ
আইএসআই বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি।
প্রধান কার্যক্রম
- সামরিক গোয়েন্দা সমন্বয়
- কাশ্মীর ও আফগানিস্তান ইস্যু
- সন্ত্রাসবিরোধী ও কৌশলগত অপারেশন
বিশেষত্ব: আফগান যুদ্ধ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এদের প্রভাব অপরিসীম। মার্কিন সিআইএ-র সাথে সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে এরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।
৮. ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (BND) – জার্মানি

- প্রতিষ্ঠা: ১৯৫৬
- সদর দপ্তর: বার্লিন
BND ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক।
প্রধান কাজ
- আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন
- অস্ত্র ও প্রযুক্তি পাচার প্রতিরোধ
- কূটনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য
বিশেষত্ব: এরা মূলত আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ফরাসি স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। এদের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত।
সফলতা: গত কয়েক দশকে ফ্রান্সের মাটিতে একাধিক বড় সন্ত্রাসী হামলা নস্যাৎ করেছে এই সংস্থা।
৯. ডিরেক্টরেট জেনারেল ফর এক্সটার্নাল সিকিউরিটি (DGSE) – ফ্রান্স

- প্রতিষ্ঠা: ১৯৮২
- সদর দপ্তর: প্যারিস
DGSE ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা ও আধাসামরিক অপারেশনের দায়িত্বে।
বিশেষত্ব: এরা মূলত আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ফরাসি স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। এদের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত।
সফলতা: গত কয়েক দশকে ফ্রান্সের মাটিতে একাধিক বড় সন্ত্রাসী হামলা নস্যাৎ করেছে এই সংস্থা।
১০. অস্ট্রেলিয়ান সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (ASIS) – অস্ট্রেলিয়া

- প্রতিষ্ঠা: ১৯৫২
- সদর দপ্তর: ক্যানবেরা
ASIS হলো Five Eyes Alliance-এর সদস্য এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে অত্যন্ত সক্রিয়।
বিশেষত্ব: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করাই এদের মূল লক্ষ্য।
উপসংহার
বিশ্বের এই শীর্ষ ১০ গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রের অদৃশ্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তাদের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, শান্তি ও নিরাপত্তার পেছনে তাদের প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

