ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই গ্রেপ্তার, ইয়াবা উদ্ধার কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের খবর মেলে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা ধরা পড়লেও আড়ালে থাকা মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মাদক ব্যবসার দৃশ্যমান অংশটুকু ভাঙা গেলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক অটুট থাকায় সমস্যা আরও গভীরে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্য, ক্রেতা টিকে থাকলে বাজারও টিকবে — তাই শুধু বিক্রেতা ধরলেই হবে না, মাদকগ্রহণকারীদের পুনর্বাসন ও অর্থের উৎস শনাক্ত করাও জরুরি।
পীরগঞ্জ পৌর এলাকার একজন প্রবীণ শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “শুধু দুই-একজন ডিলার ধরলে কিছু হবে না। যারা আড়াল থেকে পুরো চেইন নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক অভিযান দরকার। ছোট মাছ ধরা পড়ে, বড়রা ঠিকই বাইরে থাকে।”
সামাজিক কাঠামোতে প্রভাব
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবার এখন আর শুধু গোপন অপরাধ নয়, এটি ধীরে ধীরে সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। বেকারত্ব, হতাশা, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা ও সুস্থ বিনোদনের অভাবে কিছু তরুণ সহজেই এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে।
পীরগঞ্জের একজন অভিভাবক বলেন, “আগে রাতের পর শহর শান্ত থাকত। এখন অনেক পরিবার সন্তান নিয়ে আতঙ্কে থাকে। কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে — সব সময় নজর রাখতে হয়।”
শুধু আইনি সমাধান যথেষ্ট নয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার ইস্যু হিসেবে দেখলে পূর্ণ সমাধান আসবে না। এটি একইসঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও।
পীরগঞ্জের একজন সমাজকর্মী বলেন, “যে তরুণ মাদক নেয়, সে একদিনে আসক্ত হয়নি। পরিবার, বন্ধুমহল, হতাশা — সব মিলিয়ে সে দুর্বল হয়েছে। শুধু জেল দিলেই হবে না, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনও দরকার।”
ট্রানজিট পয়েন্টের ঝুঁকি
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা মাদক প্রবাহের অন্যতম কারণ। ছোট শহরগুলো এখন বড় নেটওয়ার্কের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি ও আন্তঃজেলা সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “খুচরা বিক্রেতারা তো সামনে থাকে। যারা টাকা লগ্নি করে, নিরাপদে বসে সব নিয়ন্ত্রণ করে — তাদের খুঁজে বের করা কঠিন। ভয়েও অনেকে মুখ খুলতে চায় না।”
সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি
সচেতন নাগরিকদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া প্রশাসনিক অভিযান একা যথেষ্ট হবে না। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জরুরি।
পীরগঞ্জ সরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, “বন্ধুদের চাপ, কৌতূহল কিংবা হতাশা থেকে অনেকেই প্রথমে জড়িয়ে পড়ে। পরে বের হতে পারে না। তাই শুরুতেই প্রতিরোধ দরকার।”
মানবাধিকারকর্মীরাও বলছেন, অভিযান পরিচালনায় আইনের সঠিক প্রয়োগ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি — যেন অপরাধ দমনের নামে কোনো নিরীহ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন। একইসঙ্গে প্রকৃত হোতাদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা না কমলে সরবরাহ বন্ধ হয় না। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার বিকল্প নেই।

