কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের মামলার সুবিশাল ডকুমেন্ট প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) ‘এপস্টেইন ফাইলস’ শীর্ষক এই ডকুমেন্টের আওতায় ৩০ লক্ষ পাতার নথি এবং ১ লক্ষ ২০ হাজারের ওপর ছবি প্রকাশ করা হয়।
এসব নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক রাজনীতিবিদ বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, টেক জায়ান্ট ইলন মাস্ক কিংবা ব্রিটেনের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো দুনিয়ার বহু গণ্যমান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নাম উঠে এসেছে শত শত বার। ট্রাম্প, গেটস, ক্লিনটন কিংবা মাস্ক বাদে এসব ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধেই বিকৃত ঘরানার যৌনাচার, শিশু নিপীড়ন, মানব মাংস ভক্ষণ তথা ক্যানিবালিজমে লিপ্ত থাকার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে।
এপস্টেইন ফাইলসের এসব তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এক রকম ট্রমার জোয়ারে ভাসছে গোটা দুনিয়া। সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে ইস্যুটি নিয়ে বাংলাদেশের কিছু তরুণ ও বিশ্লেষকের ভাবনা সন্নিবেশিত করা হলো এখানে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইনকিলাব মঞ্চের মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মো. নিয়াজ মাখদুম। পড়াশোনা করছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে।
এপস্টেইন ইস্যু নিয়ে নিয়াজ মাখদুম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এপস্টেইন ফাইলস বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের বিষয়ে নতুন করে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, শিশুদের যৌন নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নৈতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র এই ফাইলগুলো সামনে এনেছে, তা কেবল ব্যক্তির অপরাধের গল্প নয়; বরং “গোটা ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতার দলিল।”
তিনি বলেন, এই ঘটনাগুলো আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয় যে ক্ষমতা ও অর্থ যখন জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখন মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে। সমাজে যাদের “সম্মানিত ও প্রভাবশালী” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, অনেক সময় তারাই ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অথচ “রাষ্ট্রীয় নীরবতা, প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার অলিখিত সুরক্ষা বলয়ের কারণে” এসব অপরাধ দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকে।
একজন বাংলাদেশি তরুণ হিসেবে এপস্টেইন ফাইলস তাঁর বিবেককে নাড়া দিয়েছে জানিয়ে নিয়াজ বলেন, যারা আমাদেরকে সকাল-সন্ধ্যা মানবাধিকারের সবক দেয়, এপস্টেইন ফাইল তাদের চরিত্রকে “মোমবাতির নিচের অন্ধকারের মতো” করে প্রকাশ করে দিয়েছে। তাদের “তথাকথিত মানবতার বুলির আড়ালে থাকা যে নগ্নতা প্রকাশ পেয়েছে—তা ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলার” এখনই সময়। এই ঘটনা তথাকথিত “উন্নত বিশ্বের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে”-ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মন্তব্য করেন মাখদুম।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খোঃ রিয়াসাত ইসলাম অমিয় বলেন, সত্যি বলতে কী—এপস্টেইন ফাইলসের কথা শোনার পর থেকে মাথা কাজ করছে না। মনে হচ্ছে, মানুষ এতটা নিচে কীভাবে নামতে পারে? আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—এরা কেউ রাস্তার অপরাধী না, এরা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাবান লোকজন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে অমিয় বলেন, এসব কাজ তারা বছরের পর বছর ধরে করে আসছে। কেউ কিছু করতে পারেনি। টাকা, ক্ষমতা, নাম—সব মিলিয়ে যেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে। আর ভুক্তভোগীরা? তারা শুধু চুপ করে সহ্য করেছে। কারণ তাদের কথা শোনার মতো কেউ ছিল না।
অমিয় বলেন, বাংলাদেশি হিসেবে এটা আমাকে আলাদা করে নাড়া দেয়। কারণ আমরা নিজেরাও জানি—ক্ষমতাবান হলে অপরাধ করেও অনেক সময় পার পেয়ে যাওয়া যায়। তখন ন্যায়বিচার বইয়ের পাতায় থাকে, বাস্তবে না। অমিয় মনে করেন, এটা কোনো “স্ক্যান্ডাল” না, এটা মানুষের ভেতরের অন্ধকার দিকের খুবই বাজে একটা উদাহরণ।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সেঁজুতি দাস মুমু। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত তিনি।
মুমু বলেন, এপস্টেইন ফাইলের বর্বরতা দেখে অবাক হচ্ছে পুরো দুনিয়া। এগুলো আমরা সাধারণ মানুষ ভাবতে পর্যন্ত পারি না৷ অথচ ইন্টারনেটে একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে “ডার্কওয়েব”, সেখানে এসব ভিডিও অহরহ পাওয়া যায়। “মানুষরুপী নরপিশাচগুলো” টাকা দিয়ে এসব ভিডিও দেখে।
তাঁর ধারণা, এই বর্বরতার তথ্যপ্রমাণ হঠাৎ উন্মোচন করার পেছনে নিশ্চয় কোনো “আন্তজার্তিক রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা” রয়েছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলার কীইবা থাকে—যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়ে ওঠে। যারা নারীবাদের ঝান্ডা উড়ায় তারাই নারীকে ভক্ষণ করে। মুমুর মতে, “বিচারহীনতাই এর মূল কারণ।”
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজমুস সাঈদ বলেন, এপস্টেইন ফাইলসের “বীভৎসতার সাক্ষ্যপ্রমাণ” সামনে আসার পর থেকেই গোটা দুনিয়া ট্রমার জোয়ারে ভাসছে। আমিও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব বিষয় দেখে আঁতকে উঠেছি।
পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিচারিতার প্রসঙ্গ টেনে সাঈদ বলেন, কোনো নিম্ন আয়ের দেশ কিংবা মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রে যদি এ ধরনের “ন্যাক্কারজনক ঘটনা” ঘটতো, তাহলে পশ্চিমা বিশ্ব কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতো। এপস্টেইন ফাইলসে নাম থাকা অনেকেই তখন “মানবতাবাদী বুলি” আওড়াতেন। কিন্তু তাঁরা “বিশ্বের প্রতাপশালী ব্যক্তি” হওয়ার কারণে এখন সকলে নীরব দর্শক হয়ে রয়েছে। এ ধরনের প্রবণতাকে “কপটতা” বলেও আখ্যা দেন তিনি।
এপস্টেইন ফাইলসের সাম্প্রতিক প্রকাশকে সমসাময়িক মানবাধিকার আলোচনার এক “গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন” হিসেবে দেখেন মানবাধিকার কর্মী, গবেষক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহা. মাহামুদুল হক।
মাহামুদুল হক বলেন, এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যাঁরা প্রকাশ্যে আধুনিক মানবতাবাদ, নারী ও শিশু অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন, তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এটি প্রমাণ করে—মানবাধিকার অনেক সময় ক্ষমতাবানদের কাছে নৈতিক চর্চার বিষয় হওয়ার বদলে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মুখোশে পরিণত হয়। এই “দ্বিমুখী নৈতিকতা” মানবাধিকার আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এপস্টেইন ফাইলস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা, পুঁজিবাদ ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক কীভাবে নারী ও শিশুর মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর “কাঠামোগত সহিংসতা” আড়াল করে রাখতে পারে। এই ঘটনা আমাদের শেখায়—মানবাধিকার রক্ষা মানে কেবল নিপীড়িতের পক্ষে কথা বলা নয়, বরং সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালীদের মুখোশ উন্মোচন করার সাহস দেখানো।
মাহামুদুলের মতে, এ ধরনের ঘৃণ্য সত্য নির্ভীকভাবে সামনে আনা মিডিয়ার দায়িত্ব। এতে আবারও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ নৈতিক চর্চা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
#আরএ

