মো. আরিফুল ইসলাম, পাবনা
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বনওয়ারীনগরে দাঁড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে তাড়াশের জমিদার বনওয়ারীলাল রায় চারদিকে দিঘী খনন করে মাঝখানে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে সেই প্রাসাদভূমিতেই দাঁড়িয়ে আছে ফরিদপুর উপজেলা পরিষদ।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
বনওয়ারীলাল রায়ের পূর্বপুরুষ ছিলেন তাড়াশের জমিদার বাসুদেব তালুকদার। তিনি ঢাকার নবাব ইসলাম খাঁর আস্থাভাজন কর্মচারী ছিলেন। নবাব তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ‘চৌধুরাই তারাশ’ নামক সম্পত্তি জায়গীর হিসেবে দান করেন এবং ‘রায় চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সাঁতৈল রাজার দুইশত মৌজা নিয়েই গড়ে ওঠে এই জমিদারি।
জনশ্রুতি আছে, লাটের খাজনা দিতে পাবনা আসার পথে ফরিদপুরে বিশ্রামকালে বনওয়ারীলাল রায় স্বপ্নে এই ভূমিকে পবিত্র মনে করেন। এরপরই তিনি এখানে প্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং স্থানটির নাম রাখেন নিজের নামানুসারে — বনওয়ারীনগর।
স্থাপত্যশৈলী
প্রবেশপথে হাতি, তীরন্দাজ ও ময়ূরের আকৃতি খোদাই করা বিশাল গেট বিল্ডিং এখনো দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গেটের ডানে ছিল জমিদারের রাজস্ব অফিস, যেখানে খাজনা আদায় ও প্রজাদের অভিযোগ শোনা হতো। একশত গজ দক্ষিণে ছিল কয়েদখানা ও টাকশাল। মূল বাসভবন সংলগ্ন দিঘীতে তিন ধাপে গড়া গোসলখানা ও রানির ঘাট এখনো টিকে আছে। পাশেই ছিল হাওয়াখানা, বিনোদবিগ্রহ মন্দির ও নাট্যমন্দির — যেখানে নাচ-গানসহ নানা বিনোদন অনুষ্ঠান হতো। বাড়ি থেকে এক হাজার গজ দূরে দুধসাগর দিঘীর পাড়ে ছিল সারোদ গণপাঠাগার।
উত্তরসূরিদের অবদান
বনওয়ারীলাল রায় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ প্রতিষ্ঠায় অর্থ সহায়তা করেন। ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি দেয়। ১৯০৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দত্তকপুত্র বনমালী রায় জমিদারির দায়িত্ব নেন। তিনি পাবনায় ‘ইলিয়ট বনমালী টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ ও সিরাজগঞ্জে ‘বনওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র ক্ষিতিশভূষণ ও রাধিকাভূষণ ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি পর্যন্ত এই জমিদারি পরিচালনা করেন। পাবনা শহরে বনমালী রায়ের নির্মিত ‘তাড়াশ ভবন’ আজও স্থাপত্য ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

