প্রায় আড়াই দশক পর আবারও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতা মসনদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে ২১০টিরও বেশি আসনে এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করার পথে এগিয়ে আছে দলটি।
একই সঙ্গে, বেসরকারি হিসাব মোতাবেক, ৭১টির মতো সংসদীয় আসন জিতে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী থেকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছাত্র আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বে গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয় এবং খেলাফত মসলিসের দুই প্রার্থীর জয়সহ মোট ৮১টি আসন কুক্ষিগত করতে পেরেছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেসরকারি হিসাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বাংলাদেশ জাসদ (বিজেপি) ও গণসংহতি আন্দোলনও একটি করে আসন পেয়েছে।
এ দিকে, একই দিনে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে বেসরকারিভাবে। এর মাধ্যমে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কারের ৪৮ দফা বাস্তবায়নে নাগরিক সম্মতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে গণভোটের প্রশ্ন কাঠামো ও প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে বেশকিছু মহলে।
অনেকের মতে, প্রশ্নের জটিলতায় ভোটাররা না বুঝেই ভোট দিয়েছেন। এরপরও ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন বলে এখন পর্যন্ত খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তারেকের নেতৃত্বে পঞ্চমবার ক্ষমতার দোরগোড়ায় বিএনপি
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ যাবৎ ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল বিএনপি পাঁচবার শাসনক্ষমতায় আরোহণ করেছে। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে দলটি বিজয়ী হয় প্রথমবার।
এরপর জিয়াবধূ বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পর্যায়ক্রমে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। এবার দলের পঞ্চম শাসনকালের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে সেই জিয়া ও খালেদা জুটির জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের হাত ধরে।
মূলত, সামরিক শাসক এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরেছিল। পরবর্তী তিন নির্বাচনে দুইবার সরকার গঠন করলেও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল দলটি মাত্র একবার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটি প্রায় দেড় যুগ ছিল ক্ষমতার বাইরে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের দুটি বিএনপি বর্জন করলেও অপর একটিতে ঘটে ভরাডুবি। এই দেড় যুগের আওয়ামী শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হয় তুমুল দমন-পীড়ন।
এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সামনে আবার ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অপর দিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞায় নিবন্ধন স্থগিত থাকার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ফলে ৩৫ বছরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাড়া নতুন মেরুকরণের এই নির্বাচনে সৃষ্ট শূন্যতার সুযোগে ভোটের মাঠে শক্তিশালীভাবে আবির্ভূত হয় খোদ বিএনপিরই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
প্রাথমিক ভোট গণনার নিরিখে, দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে কখনো ৩০টির বেশি আসন না পাওয়া দলটি এবার বিএনপির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে ৭১টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে বলে জানা যাচ্ছে।
‘দুই বেগমের যুগ’-এর অবসান
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের তাবৎ রাজনীতি গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আবর্তিত হয়েছে মূলত বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে।
কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশক টানা ক্ষমতায় থাকার পর ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁর ঘাড়ে ঝুলছে মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ডের সাজাও। অন্য দিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার কয়েক সপ্তাহের মাথায়ই গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া।
অথচ এই দুই নারী দেশের রাজনীতিতে ছিলেন সবসময় নিজেদের তুমুল প্রতিপক্ষ। এক জন সরকারে থাকলে, অন্য জন বিরোধী দলে থেকে রাজপথে আন্দোলন করতেন। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো এই বৈরিতাকে ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ নামেও আখ্যায়িত করতো। কিন্তু সমসাময়িক বাস্তবতায় দুজনই বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে চলে যাওয়ায় ‘দুই বেগমের যুগ’-এর অবসান ঘটেছে বলে মত দিচ্ছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
নির্বাচনি মাঠ ও প্রচার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৮।
প্রচারের মাঝপথে জামায়াতের এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত হয়। বাকি ২৯৯ আসনে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয় ১২ ফেব্রুয়ারি।
এর আগে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে শক্ত প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেয় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিতর্কিত অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সাজা হওয়ার পরও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে মানুষের কাছে বিপুল সাড়া পায় দলটি। প্রচারণায় বেশ উজ্জীবিত কার্যক্রমও পরিচালনা করে দেশের সবথেকে বৃহৎ ইসলামপন্থী দল বলে খ্যাত জামায়াত।
একইভাবে, জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এনসিপি। এরপর থেকেই জুলাইয়ের চেতনা, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্টকাঠামো, সংবিধান সংস্কার কার্যক্রম এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ইস্যুতে সরব ভূমিকা পালন করে দলটি।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী দৌঁড়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এনসিপিও ভোটের পুরোটা সময় ছিল আলোচনায়।
অপর দিকে, লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে বিপুল সংবর্ধনায় নির্বাচনি যাত্রা শুরু করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান। দেশ গঠনের ‘পরিকল্পনা’ তুলে ধরে তিনি জনগণের সমর্থন চান।
তবে দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে শোকের মধ্যেই নির্বাচনি নেতৃত্ব দেন তিনি।
এ সময়, প্রচারে বিএনপি জামায়াতকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। “মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা ও ধর্মের নামে রাজনীতি” করার অভিযোগ তুলে দলটিকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় বিএনপির পক্ষ থেকে।
পাল্টা কৌশল হিসেবে জামায়াত তাদের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে সামনে এনে ভিন্ন ঘরানার প্রচার চালায়। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে “দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির” বিরুদ্ধে কঠোরতার আশ্বাস দেয় তারা। নারী অধিকার প্রসঙ্গে জামায়াত নেতৃবৃন্দের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
ভোটের দিন ও অভিযোগ
১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন গোটা দেশে ভোটগ্রহণ মোটাদাগে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে পাঁচজন হঠাৎ অসুস্থতায় এবং একজন হুড়োহুড়িতে মারা যান বলে জানানো হয়। তবে কোথাও ভোট স্থগিত বা বাতিলের ঘটনা ঘটেনি।
ভোটগ্রহণ সমাপ্তির পর এ দিন রাতে জামায়াত জোট কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট গণনায় বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তোলে। দুপুর পর্যন্ত ভোট সন্তোষজনক থাকলেও পরে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে এনসিপিও। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও কিছু কেন্দ্রে নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরে।
তবে নির্বাচন কমিশন জানায়, দেশের কোথাও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কমিশনের পক্ষ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টায় ৪৭.৯১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দিলেও পুরো দিনের হার তখনও প্রকাশ করা হয়নি।
এ দিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্র ঘুরে ভোটার অংশগ্রহণকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন। বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সংগ্রহের কথাও জানান তিনি।
পরে রাতের দিকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, কিছু আসনে রিটার্নিং অফিসাররা ফল ঘোষণা বিলম্বিত করছেন। তবে সামগ্রিকভাবে পরিপূর্ণ ফল আসার পর জোটের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
একইভাবে, ঢাকা-৮ আসনে ফল পাল্টানোর অভিযোগ নিয়ে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে যান। আসনটিতে শেষ পর্যন্ত মির্জা আব্বাসকেই বিজয়ী দেখানো হয় বেসরকারিভাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিক্রিয়া
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় জাতিকে অভিনন্দন জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
ইউনূসের ভাষায়, ভোটারদের “স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সংশ্লিষ্টদের পেশাদারিত্ব” গণতন্ত্রের প্রতি দেশের অঙ্গীকারের প্রমাণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের মধ্য দিয়ে তিন দশক পর বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের পদে আসছে নতুন মুখ। নতুন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী হিসেবে জামায়াতের উত্থান, সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের অনুমোদন এবং আওয়ামী লীগবিহীন রাজনীতিতে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মিশেলে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশের যুগসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে তাদের ভাষায়।
#আরএ

