রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য সময়। ইসলামি শরিয়তে রোজা ফরজ ইবাদত হিসেবে নির্ধারিত, যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম।
রোজা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়জুড়ে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা এবং কিছু বিধান যথাযথভাবে মানার নামই সিয়াম। এসব বিধান লঙ্ঘিত হলে রোজা ভঙ্গ হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে রোজা ভঙ্গ না হলেও তা মাকরুহ হয়ে যায়।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সক্ষম মুসলমানের ওপর রমজানের রোজা ফরজ। ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা না রাখা বা রোজা ভঙ্গ করা মারাত্মক গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। তাই কোন কোন কারণে রোজা ভঙ্গ হয়—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
শরিয়তের দৃষ্টিতে, ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা রোজা ভঙ্গের একটি কারণ। আবার বমি আপনা-আপনি মুখে এলেও যদি তার বেশির ভাগ ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, সেক্ষেত্রেও রোজা নষ্ট হয়ে যায়। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক ঋতুস্রাব বা সন্তান প্রসব-পরবর্তী রক্তপাত শুরু হলে রোজা ভেঙে যায়, যা শরিয়তসম্মত একটি বিধান।
একইভাবে কেউ যদি ইসলাম ত্যাগ করে, তবে তার রোজাও ভঙ্গ বলে গণ্য হয়। চিকিৎসাজনিত কিছু কাজও রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে। গ্লুকোজ, শক্তিবর্ধক ইনজেকশন বা সেলাইন গ্রহণ করলে রোজা থাকে না। এ ছাড়া, প্রস্রাব বা পায়খানার রাস্তা দিয়ে ওষুধ বা অন্য কিছু শরীরে প্রবেশ করালেও রোজা ভেঙে যায়। কান বা নাক দিয়ে ওষুধ প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। পাশাপাশি, রোজা স্মরণ থাকা অবস্থায় অজু করার সময় কুলি বা নাকে পানি দেওয়ার সময় ভেতরে পানি চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়।
কিছু পরিস্থিতিতে ভুল ধারণার কারণেও রোজা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ইফতারের সময় হয়েছে মনে করে সূর্যাস্তের আগেই ইফতার করা, অথবা ভুলবশত কিছু খেয়ে রোজা ভেঙে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে আবার খাওয়া–এর উদাহরণ।
বৃষ্টির পানি মুখে পড়ার পর তা ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললেও রোজা ভেঙে যায়। দাঁতের ফাঁকে থাকা ছোলা পরিমাণ কোনো কিছু জিহ্বা দিয়ে বের করে খেলে কিংবা অল্প বমি মুখে আসার পর তা ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললেও রোজা নষ্ট হয়।
রোজাদারকে যদি জোরপূর্বক কেউ কিছু খাইয়ে দেয়, তাতেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়—যদিও এখানে রোজাদারের ইচ্ছা জড়িত থাকে না। এসব বিধান ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ফাতাওয়ায়ে শামি ও ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রোজার মৌলিক শর্ত হলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার ও সব ধরনের শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা। তবে এই সময়ের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভঙ্গ হয় না।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, অনেক বিষয় আছে যেগুলোকে মানুষ ভুল করে রোজা ভঙ্গের কারণ মনে করে। এর মধ্যে সুগন্ধি ব্যবহার, বারবার থুতু ফেলা বা থুতু গিলে ফেলা, মেছওয়াক করা, সাজসজ্জা করা, নখ বা চুল কাটার মতো কর্মকাণ্ডের কারণে রোজা ভাঙে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তবে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক সংযম নয়। মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, অন্যায় আচরণ, ঘুষ গ্রহণ বা অন্যের হক নষ্ট করার মতো কাজ রোজার আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এসব কাজে লিপ্ত হলে রোজা বাহ্যিকভাবে থাকলেও তার প্রকৃত মূল্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই রমজানের রোজা পালনের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান জানা ও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
#আরএ

