আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলেই বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য, শুদ্ধতা ও ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এ বছর সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলা শব্দভান্ডারে আজাদী, ইনকিলাব, ফায়সালা, সিলসিলার মতো আরবি-ফারসি উৎসজাত শব্দের ব্যবহার।
দেশি-বিদেশি শব্দের বিভাজন কতটা যৌক্তিক, নাকি এটি ভাষার রাজনীতিরই একটি রূপ — এই প্রশ্ন ঘিরেই চলছে এখন পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক।
এরই মধ্যে এবার এই বিতর্কে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ফাতিমা তাসনিম জুমা। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে দেওয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারকে ‘দেশি-বিদেশি’ ভাগে ভাগ করার প্রবণতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
জুমার ভাষ্য অনুযায়ী, বিপ্লব যেমন তার, ইনকিলাবও তেমনি তার। স্বাধীনতার পাশাপাশি আজাদীর দাবিও তার কাছেই সমান স্বাভাবিক। একজন ভাষাভাষী যে শব্দে সাবলীল, সেটিই তার ভাষার অংশ।
এটাই মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, শব্দের উৎসের ভিত্তিতে কাউকে ‘পর’ করে দেওয়া ভাষাচর্চা নয়। বরং এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল।
তাঁর মতে, ধীরে ধীরে বাংলাকে নিজস্ব কিছু নেই — এমন এক বোধ তৈরি করতে চায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি ইংরেজি ভাষার উদাহরণ টেনে আনেন। ইংরেজি ভাষাভাষীরা বিশ্বের নানা প্রান্তের শব্দ নিজেদের ভাষায় গ্রহণ করেছে। শব্দগুলোর উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক শব্দের শিকড় অন্য ভাষায়। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারে সেগুলোকে কখনোই ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হয় না। শব্দটি ইংরেজিতেই থেকে যায়। সেখানে উৎস একটি ভাষাতাত্ত্বিক তথ্য, কোনো সাংস্কৃতিক বিভাজনের হাতিয়ার নয়।
এ দিকে, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে — এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। আজাদী বা ইনকিলাবের মতো শব্দকে অনেক সময় ‘বিদেশি’ তকমা দিয়ে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
সেসবের পরিপ্রেক্ষিতে জুমা বলেন, অথচ ঐতিহাসিকভাবে এই শব্দগুলোই বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাষ্য নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে শ্রমিক আন্দোলন — সবখানেই এসব শব্দ ছিল উচ্চারিত বাস্তবতার অংশ।
ফাতিমা তাসনিম জুমার মতে, শব্দ নিয়ে রাজনীতি এবং শব্দের রাজনীতি — দুটোরই সূচনা ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ভাষার ভেতরে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে সমাজকেও ভাগ করার এই প্রবণতা এখনও বহাল আছে। কারা কোন শব্দ ব্যবহার করবে, কোন শব্দ ‘খাঁটি’ আর কোনটি ‘অশুদ্ধ’—এই সিদ্ধান্ত আসলে ক্ষমতার ভাষ্য থেকেই আসে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলা ভাষা কি একটি খোলা প্রবাহ, যেখানে বিভিন্ন উৎসের শব্দ এসে মিশে নতুন অর্থ ও শক্তি তৈরি করবে? নাকি সেটিকে সংকীর্ণ সংজ্ঞার ভেতর আটকে ফেলা হবে?
ভাষাবিদদের একাংশের মতে, জীবন্ত ভাষা কখনোই বিশুদ্ধতার দেয়াল তুলে টিকে থাকে না; বরং গ্রহণ, রূপান্তর ও ব্যবহারেই তার প্রাণ।
এই বাস্তবতায় আজাদী, ইনকিলাব, ফায়সালা বা সিলসিলার মতো শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক কেবল ভাষাগত নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকও। মাতৃভাষা দিবস সেই প্রশ্নটাই সামনে আনছে — বাংলা ভাষা কি তার ব্যবহারকারীদের হাতেই থাকবে, নাকি শব্দের লেবেলিংয়ের রাজনীতিতে আরও সংকুচিত হবে?
#আরএ

