মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি | লোহাগাড়ার আকাশ-বাতাস যেন রবিবার সকাল থেকেই উৎসবের বার্তা বহন করছিল। ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি আর মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে সুখছড়ী রহমানিয়া দাখিল মাদরাসা সংলগ্ন বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। প্রতি বছরের ন্যায় আজ রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সেখানে অনুষ্ঠিত হলো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় মাহফিল ও ঘোড়দৌড় মেলা—যা শতবর্ষ পেরিয়েও আজও অটুট, অবিচল ও প্রাণবন্ত।
এ মেলা কেবল একটি আয়োজন নয়, এটি গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক। সময়ের স্রোতে বহু ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও এই সভা আজও টিকে আছে মৌলানা মফজিলুর রহমান (রাহঃ)-এর বংশধরদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। মুসলিম সমাজ থেকে বিধর্মী ও বিজাতীয় সংস্কৃতি উচ্ছেদের লক্ষ্যে তিনি যে ধর্মীয় মাহফিল ও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার সূচনা করেছিলেন, তা আজ শতবর্ষ পরে এসে আরও দৃঢ়ভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ধর্মীয় মাহফিলের পবিত্রতা আর ঘোড়দৌড়ের রোমাঞ্চ—এই দুইয়ের অনন্য মেলবন্ধনই এ আয়োজনকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন এই মেলায়। যেন এটি কেবল দেখার নয়, অংশগ্রহণের এক ঐতিহ্য।
মেলাকে কেন্দ্র করে মাঠজুড়ে বসে অস্থায়ী দোকান। গৃহস্থালি জিনিসপত্রের পসরা, হরেক রকম মিষ্টিজাত সামগ্রী, শিশুদের খেলনা—সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির এক প্রাণচাঞ্চল্য দৃশ্য। বিশেষ করে মাটির রঙিন পাতিলে ভরা মিঠাই এই মেলার সবচেয়ে আবেগঘন অনুষঙ্গ। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী অনেক পরিবার এখান থেকে মিঠাই কিনে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে উপহার পাঠান।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই মাটির পাতিল ভরা মিঠাই সময়মতো শ্বশুরবাড়িতে না পাঠালে অনেক গৃহস্থবাড়িতে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হতো, এমনকি বউ-ঝিরা বাপের বাড়িতে মাসের পর মাস অবস্থান করত—এই বিশ্বাস যুগ যুগ ধরে এ সভাকে ঘিরেই বেঁচে আছে। এটি নিছক গল্প নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের বিশ্বাস, সম্পর্ক আর আবেগের প্রতিফলন।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী সভা ও ঘোড়দৌড় মেলা তাই শুধু বিনোদন নয়—এটি ধর্মীয় চেতনা, সামাজিক বন্ধন ও লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এই আয়োজন প্রমাণ করে, শেকড়ের টান থাকলে শত বছরও সময় কোনো ঐতিহ্যকে মুছে দিতে পারে না।

