পুরান ঢাকার শ্রীশদাস লেনে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিং শুধু একটি আবাসিক ভবন বা রেস্তোরাঁ নয়; এটি ঢাকার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রায় সাত দশকের বেশি সময় ধরে এই জায়গাটি কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও রাজনীতিবিদদের আড্ডাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত
।১৯৪৯ সালে প্রহ্লাদ সাহা ও নলিনী মোহন দাস যৌথভাবে ১১ কাঠা জমির ওপর এই বোর্ডিংটি গড়ে তোলেন। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িটি তখনকার সময়ের একটি পরিচিত আবাসিক বোর্ডিং হিসেবে পরিচিতি পায়। ‘বিউটি বোর্ডিং’ নামটি রাখা হয় প্রহ্লাদ সাহার মেয়ের নাম অনুসারে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিউটি বোর্ডিং হয়ে ওঠে ঢাকার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল। পল্লীকবি জসীমউদ্দিনসহ বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে নানা আলোচনায় মুখর থাকত এই আড্ডা।
ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সঙ্গেও এই জায়গাটির সম্পর্ক রয়েছে। কথিত আছে, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ঢাকায় এলে এখানে সময় কাটিয়েছেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও এখানে আড্ডায় অংশ নিয়েছেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। এসব কারণে বিউটি বোর্ডিং শুধু একটি ভবন নয়, বরং পুরান ঢাকার স্মৃতিবহ এক সাংস্কৃতিক স্থান হিসেবে পরিচিত।
স্থাপত্যের দিক থেকেও বাড়িটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য বহন করে। ভেতরে রয়েছে খোলা উঠান, চারপাশে বারান্দা এবং কাঠের দরজা-জানালার ব্যবহার। পুরোনো ঢঙের এই বাড়ির পরিবেশে এখনো অতীতের ছাপ স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
বর্তমানে বিউটি বোর্ডিং আবাসিক ব্যবস্থা ও রেস্তোরাঁ দুইভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ভেতরে একটি খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে দেশীয় খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেকেই শুধু খাওয়ার জন্যও এখানে আসেন, আবার কেউ কেউ পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক পরিবেশ অনুভব করার জন্য ঘুরে দেখতে আসেন।
আজকের ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেও বিউটি বোর্ডিং যেন পুরান ঢাকার ইতিহাসের এক টুকরো স্মৃতি ধরে রেখেছে। সাহিত্যিক আড্ডা, রাজনৈতিক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সেই সময়ের আবহ এখনো অনেকের কাছে এই জায়গাটিকে বিশেষ করে তুলেছে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে গুলিস্তান বা সদরঘাট এলাকায় বাসে করে আসা যায়। সেখান থেকে রিকশা বা হেঁটে পুরান ঢাকার শ্রীশদাস লেনে পৌঁছালে বিউটি বোর্ডিং পাওয়া যাবে। স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করলেও সহজেই জায়গাটি খুঁজে পাওয়া যায়।
যা দেখবেন
বিউটি বোর্ডিংয়ের পুরোনো স্থাপত্য, খোলা উঠান, বারান্দা ও কাঠের দরজা-জানালার গঠন দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। পাশাপাশি এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতির কথাও জানা যায়।
কোথায় খাবেন
বিউটি বোর্ডিংয়ের ভেতরেই একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে দেশীয় খাবার পরিবেশন করা হয়। এছাড়া আশপাশের চকবাজার ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী খাবারের অনেক দোকান রয়েছে।
কোথায় থাকবেন
বিউটি বোর্ডিংয়ে সীমিত আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া গুলিস্তান, মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল ও গেস্টহাউস পাওয়া যায়। রাজধানীর অন্য এলাকা থেকেও একদিনের ভ্রমণে এখানে এসে ঘুরে দেখা সম্ভব।

