গাজীপুরের মাওনায় প্রায় ৩৬৯০ একর জুড়ে বিস্তৃত বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক দেশের অন্যতম বৃহৎ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।
টিলা আর শালবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এই পার্কে মানুষ নয়, বরং প্রাণীরাই থাকে স্বাধীনভাবে। আর দর্শনার্থীরা প্রবেশ করেন তাদের জগতে।
প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণের এক সমন্বিত অভিজ্ঞতা দিতে এই পার্ক এখন ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম গন্তব্য।পার্কটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত: বঙ্গবন্ধু স্কয়ার, বায়োডাইভারসিটি পার্ক, সাফারি কিংডম এবং এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি। প্রতিটি অংশেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যা দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা।
উল্লেখ্য, বর্তমানে পার্কটির নাম গাজীপুর সাফারি পার্ক (Gazipur Safari Park) নামে পরিচিত। আগে এর নাম ছিল Bangabandhu Sheikh Mujib Safari Park। ২০২৪ সালের পর নাম পরিবর্তন করে নতুনভাবে “গাজীপুর সাফারি পার্ক” নামে চালু করা হয়।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে যাবেন যে কারণে
ঢাকার কোলাহল আর কংক্রিটের ক্লান্তি থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সবচেয়ে সহজ গন্তব্যগুলোর একটি হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক।
গাজীপুরের ভাওয়াল শালবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এই সাফারি পার্ক শুধু বিনোদনের স্থান নয়, এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, গবেষণা ও পরিবেশ সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পরিবার, শিক্ষার্থী কিংবা প্রকৃতিপ্রেমী- সব ধরনের দর্শনার্থীর কাছেই পার্কটির আবেদন আলাদা।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে যা দেখবেন

এই সাফারি পার্কের প্রধান আকর্ষণ কোর সাফারি। নির্দিষ্ট গাড়িতে করে প্রবেশ করতে হয় এই অঞ্চলে, যেখানে উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে বাঘ, সিংহ, হরিণ, জেব্রা ও জিরাফসহ নানা বন্যপ্রাণী। খাঁচার বাইরে প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ কাছ থেকে দেখার এই অভিজ্ঞতা দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
বায়োডাইভারসিটি পার্কে রয়েছে দেশীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংরক্ষিত সংগ্রহ, যা পরিবেশ সচেতনতার এক জীবন্ত পাঠশালা।
সাফারি কিংডম অংশে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী প্রদর্শনী, শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক স্থান এবং শিক্ষামূলক প্রদর্শনী।
এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি অংশে এশীয় প্রাণীদের আবাসস্থল তৈরি করা হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রেখে।
শালবনের গভীর সবুজ আর টিলাময় ভূপ্রকৃতি পার্কটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। এখানে হাঁটতে হাঁটতে কখনো শোনা যায় পাখির ডাক, কখনো চোখে পড়ে বুনো প্রাণীর চলাফেরা সব মিলিয়ে এটি প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার এক অনন্য সুযোগ।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে কোথায় খাবেন?
পার্কের ভেতরেই রয়েছে ক্যান্টিন ও খাবারের স্টল, যেখানে ভাত, ডাল, সবজি, ভাজা খাবার এবং হালকা নাস্তা পাওয়া যায়। তবে খাবারের মান ও বৈচিত্র্য সীমিত হওয়ায় অনেক দর্শনার্থী বাইরে থেকে শুকনো খাবার নিয়ে আসেন।
পার্কের বাইরে গাজীপুর চৌরাস্তা বা চান্দনা এলাকায় বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্টে দেশীয় খাবার পাওয়া যায়। পরিবার নিয়ে এলে দুপুরের খাবার বাইরে সেরে নেওয়াই অনেকের কাছে সুবিধাজনক।
তবে ভিড়ের দিনে আগে থেকে খাবারের পরিকল্পনা রাখা সুবিধাজনক। অনেকে নিজেরা খাবার সঙ্গে নিয়েও আসেন।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে বেড়াতে গিয়ে কোথায় থাকবেন?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে দিনের ভ্রমণই বেশি জনপ্রিয় হলেও আশপাশে রাতযাপনের ব্যবস্থা আছে। গাজীপুর শহরে মাঝারি মানের হোটেল ও গেস্টহাউস পাওয়া যায়।
এছাড়া ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের আশপাশে কিছু রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকা যায়। যারা একটু উন্নত সুবিধা চান, তারা ঢাকায় অবস্থান করেও একদিনে পার্ক ঘুরে ফিরে যেতে পারেন।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রকৃতির সঙ্গে বন্যপ্রাণী দেখার বিরল সুযোগ। এখানে প্রাণীদের খাঁচাবন্দি নয়, তুলনামূলক মুক্ত পরিবেশে দেখা যায়, যা শিশুদের জন্য শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
একই সঙ্গে এটি দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা দেয়। স্বল্প সময়ে, কম খরচে এবং নিরাপদ পরিবেশে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের সংস্পর্শ পেতে চাইলে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক একটি কার্যকর গন্তব্য।
ঢাকা থেকে গাজীপুর সাফারি পার্ক কিভাবে যাব?
ঢাকা থেকে যাওয়ার সহজ উপায়ঃ
বাসে
মহাখালী, আব্দুল্লাহপুর বা উত্তরা থেকে ময়মনসিংহ/শ্রীপুরগামী বাসে উঠুন।
“বাঘের বাজার” নেমে অটোরিকশায় সাফারি পার্কে যান।
ব্যক্তিগত গাড়িতে
ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে ধরে বাঘের বাজার পর্যন্ত গিয়ে পশ্চিম দিকে প্রবেশ সড়ক ব্যবহার করতে হবে।
ট্রেনে
ঢাকা থেকে গাজীপুর বা শ্রীপুর পর্যন্ত ট্রেনে এসে পরে স্থানীয় যানবাহনে পার্কে যাওয়া যায়।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে কিভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে মাওনা চৌরাস্তা পর্যন্ত যেতে হবে। সেখান থেকে অল্প দূরেই বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক।
নিজস্ব গাড়ি, ভাড়া গাড়ি বা বাসে সহজেই যাওয়া যায়। ঢাকার মহাখালী বা গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে সরাসরি মাওনা গামী বাস পাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে যাওয়া বেশ সহজ। গুলিস্তান, মহাখালী বা গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা বা চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত নিয়মিত বাস চলাচল করে। সেখান থেকে অটোরিকশা বা সিএনজি নিয়ে সরাসরি সাফারি পার্কের মূল ফটকে পৌঁছানো যায়।
ব্যক্তিগত গাড়িতে গেলে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে চান্দনা চৌরাস্তা অতিক্রম করে ভাওয়াল রাজবাড়ীর দিকের সড়ক ধরে এগোতে হবে। সড়কপথ ভালো হওয়ায় যাত্রা স্বস্তিকর।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে প্রবেশ টিকিট মূল্য ২০২৬
পর্যটকের ধরনের উপর গাজীপুর জাতীয় সাফারি পার্কের টিকিটের মূল্য নির্ভর করে। নিচে পর্যটকের ধরণ ও টিকিটের দাম উল্লেখ করা হলো-
| পর্যটকের ধরন | মূল্য |
| প্রাপ্তবয়স্ক | ৫০ টাকা |
| শিশু / অপ্রাপ্তবয়স্ক | ২০ টাকা |
| শিক্ষার্থী | ১০ টাকা |
| বিদেশি পর্যটক | প্রায় ৫ ডলার বা সমমূল্যের টাকা |
| কোর সাফারি বাস রাইড | ১০০–১৫০ টাকা |
ছুটির দিন বা বিশেষ ইভেন্টে মূল্য কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক বন্ধ ও খোলার সময়সূচী
মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই পার্ক।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ফোন নাম্বার
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যোগাযোগ নম্বরগুলো হলোঃ
- +8801842-434401
- +8801837199144
- +8801831322222
নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে, তাই অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যাচাই করা ভালো।
গাজীপুর সাফারি পার্ক নিয়ে বারবার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সাফারি পার্ক কোনটি?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফারি পার্ক হলো (Gazipur Safari Park)। এটি প্রায় ৩৮১০ একর থেকে ৪৯০৯ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সাফারি পার্ক হিসেবেও পরিচিত।
গাজীপুর সাফারি পার্ক কোথায় অবস্থিত?
Gazipur Safari Park গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বাঘের বাজার এলাকায় অবস্থিত। এটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার ভেতরে। ঢাকার উত্তর দিক থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০–৫০ কিলোমিটার।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক কবে বন্ধ থাকে?
সাধারণত পার্কটি প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। বাকি ৬ দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খোলা থাকে। সরকারি ছুটিতে সময়সূচি পরিবর্তন হতে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পার্ক কোনটি?
জাতীয় উদ্যান হিসেবে Bhawal National Park বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বনভিত্তিক পার্ক। আর সাফারি পার্ক হিসেবে সবচেয়ে বড় হলো Gazipur Safari Park।
গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে সাফারি পার্ক যাওয়ার উপায় কী?
গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে প্রথমে ময়মনসিংহগামী বাসে বাঘের বাজার নামতে হবে। এরপর সেখান থেকে: অটোরিকশা, রিকশা, সিএনজি দিয়ে সরাসরি সাফারি পার্কে যাওয়া যায়। বাঘের বাজার থেকে দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার।

