পুরান ঢাকার টিকাটুলির ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা রোজ গার্ডেন প্যালেস। উনিশ শতকে নির্মিত এই প্রাসাদটি শুধু একটি স্থাপত্যকীর্তিই নয়, বরং পুরান ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
এক সময় গোলাপ ফুলের সুবাসে ভরা এই বাগানবাড়ি এখনো ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এক অনন্য দর্শনীয় স্থান। রোজ গার্ডেন প্যালেস নির্মাণ করেন উনিশ শতকের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস।
কথিত আছে, সে সময়ের জমিদার ও অভিজাতদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি নিজের জন্য একটি আলাদা প্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই ভাবনা থেকেই প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠে এই দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ।
প্রাসাদের চারপাশে তিনি বিপুল সংখ্যক গোলাপ ফুলের চাষ করতেন। এই গোলাপ বাগানের কারণেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘রোজ গার্ডেন’।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে রোজ গার্ডেন প্যালেস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে করিন্থীয় ও গ্রীক স্থাপত্যরীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
প্রাসাদের সম্মুখভাগে রয়েছে উঁচু স্তম্ভ, সুদৃশ্য বারান্দা এবং অলংকরণসমৃদ্ধ নকশা, যা ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্যের প্রতিফলন। প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে প্রশস্ত হলরুম, অলংকৃত সিঁড়ি এবং দৃষ্টিনন্দন ছাদনকশা, যা সেই সময়কার অভিজাত জীবনযাপনের পরিচয় দেয়।
১৯৩৭ সালে ব্যবসায়িক সংকটে পড়ে হৃষিকেশ দাস দেউলিয়া হয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত প্রাসাদটি বিক্রি করে দেন ব্যবসায়ী আব্দুর রশীদের কাছে। নতুন মালিক প্রাসাদের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘রশীদ মঞ্জিল’।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এটি রশীদ পরিবারের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সময়ের পরিবর্তনে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
যা দেখবেন
রোজ গার্ডেন প্যালেসে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়বে সুদৃশ্য প্রাসাদ ভবন ও এর সামনের খোলা প্রাঙ্গণ। প্রাসাদের সম্মুখভাগের করিন্থীয় স্তম্ভ ও নকশা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ভেতরে রয়েছে বড় বড় হলরুম, প্রাচীন ধাঁচের সিঁড়ি ও অলংকৃত দেয়াল। পাশাপাশি প্রাসাদের চারপাশের বাগান এলাকা ঘুরে দেখলে বোঝা যায় এক সময় এখানে গোলাপের বিশাল বাগান ছিল। ইতিহাস ও স্থাপত্যে আগ্রহী দর্শনার্থীদের জন্য এটি একটি অনন্য অভিজ্ঞতা।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে গুলিস্তান বা পুরান ঢাকার দিকে বাসে করে এসে টিকাটুলি এলাকায় নামা যায়। সেখান থেকে রিকশা বা হেঁটে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় রোজ গার্ডেন প্যালেসে।
কমলাপুর রেলস্টেশন থেকেও দূরত্ব খুব বেশি নয়, রিকশায় অল্প সময়েই পৌঁছানো সম্ভব।
প্রবেশ সময় ও টিকিট
গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার এটি বন্ধ থাকে।
প্রবেশমূল্য সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ৩০ টাকা। শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা, তবে আইডি কার্ড থাকতে হবে। ১০ বছরের নিচে শিশুদের প্রবেশ ফ্রি। সার্কভুক্ত দেশের পর্যটকদের জন্য টিকিট ২০০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারিত।
কোথায় খাবেন
রোজ গার্ডেন প্যালেসের আশপাশে পুরান ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান রয়েছে। টিকাটুলি, ওয়ারী ও গুলিস্তান এলাকায় স্থানীয় রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি, কাবাব, নানসহ নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
দূর থেকে আসা পর্যটকরা থাকার জন্য গুলিস্তান, মতিঝিল বা পল্টন এলাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেল বেছে নিতে পারেন। এসব স্থানের হোটেল থেকে রোজ গার্ডেন প্যালেসে যাতায়াতও বেশ সহজ।
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও অতীতের জীবনযাপনের সাক্ষী হিসেবে রোজ গার্ডেন প্যালেস আজও দর্শনার্থীদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে এটি ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

