রাজধানী ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ সংগ্রহশালা। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অতীতের নানা স্মারক, শিল্পকর্ম ও প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণ করে আসছে এই জাদুঘর।
ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক কিংবা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি এক অনন্য আকর্ষণ। মূলত জাদুঘরটির সূচনা হয় ১৯১৩ সালে। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার গভর্নর থমাস ডেভিড গিবসন কারমাইকেল-এর উদ্যোগে “ঢাকা জাদুঘর” নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রথমদিকে এটি ছিল তুলনামূলক ছোট একটি সংগ্রহশালা, যেখানে সীমিতসংখ্যক প্রত্ননিদর্শন ও ঐতিহাসিক বস্তু প্রদর্শিত হতো। সময়ের সঙ্গে সংগ্রহ বাড়তে থাকে এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ১৯৮৩ সালে জাদুঘরটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
বর্তমানে জাদুঘরটিতে প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য, মূর্তি, অস্ত্রশস্ত্র, লোকশিল্প, নকশিকাঁথা, পোশাক, চিত্রকর্ম, মুক্তিযুদ্ধের দলিল এবং নানা ঐতিহাসিক দলিলপত্র।
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, শিল্পকলার বিকাশ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এখানে রয়েছে আলাদা আলাদা গ্যালারি। জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে ঘুরে দেখা যায় প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার নিদর্শন, মধ্যযুগীয় শিল্পকর্ম এবং বাংলার লোকঐতিহ্যের নানা উপকরণ।
মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে সংরক্ষিত রয়েছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও স্মারক, যা দর্শনার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়।
সময়সূচি ও প্রবেশমূল্য
দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে শুক্রবারে এটি দুপুর ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলোতে জাদুঘরটি খোলা থাকে।
প্রবেশমূল্যও তুলনামূলকভাবে স্বল্প। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট মূল্য ৪০ টাকা এবং ৩ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের পর্যটকদের জন্য প্রবেশমূল্য ৩০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিভাবে যাবেন
রাজধানীর যেকোনো স্থান থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত বাস, সিএনজি বা রাইডশেয়ার সেবায় সহজেই পৌঁছানো যায়। শাহবাগ মোড় থেকে অল্প হাঁটার পথেই বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান ফটক।
যা দেখবেন
জাদুঘরের চারতলা ভবনে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, লোকশিল্প, মুক্তিযুদ্ধ এবং সমকালীন শিল্পের আলাদা গ্যালারি। প্রাচীন মূর্তি, মুদ্রা, নকশিকাঁথা, পুঁথি, চিত্রকর্ম এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
কোথায় খাবেন
জাদুঘর এলাকা ঘিরে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রয়েছে অসংখ্য খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্ট। পাশাপাশি কাছেই অবস্থিত স্টার কাবাব ও টি এস সি ক্যাফেটেরিয়া-এও বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
দূর থেকে আগত পর্যটকদের জন্য শাহবাগ ও রমনা এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল। এর মধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা এবং হোটেল শাহবাগ ইন্টারন্যাশনাল পর্যটকদের কাছে পরিচিত ও সুবিধাজনক।
দেশের অতীতের অমূল্য স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসকে জানার এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বার। প্রতি বছর অসংখ্য দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী এখানে এসে বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।

