জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একযোগে ৪০টি দেশ থেকে পোলট্রি ও ডিম আমদানি নিষিদ্ধ করেছে সৌদি আরব। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার একাধিক দেশ।
মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে উচ্চমাত্রার বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা-এর ঝুঁকি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের মতে, বৈশ্বিক পর্যায়ে ভাইরাসটির বিস্তার এবং কিছু দেশে পুনরায় সংক্রমণের খবর আমদানিনীতিতে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।
সিদ্ধান্তটি কার্যকর করেছে দেশটির সৌদি ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটি। সংস্থাটি জানায়, কাঁচা মুরগির মাংস, ডিম এবং জীবিত পোলট্রি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। সর্বশেষ তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইরান, জাপান ও মিশরের নাম রয়েছে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও ইতালিসহ কয়েকটি দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে আংশিক আমদানিও স্থগিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে বড় না হলেও খাতভিত্তিক দৃষ্টিতে তা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে পোলট্রি শিল্প প্রধানত অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে হালাল পোলট্রি ও ডিম রপ্তানির সম্ভাবনা দীর্ঘদিনের। সৌদি আরব সেই সম্ভাব্য বাজারগুলোর অন্যতম।
কিন্তু বার্ড ফ্লু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সতর্কতার কারণে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় পড়েছে। যদিও দেশে বড় পরিসরে সাম্প্রতিক কোনো মারাত্মক প্রাদুর্ভাব নেই, তবুও বৈশ্বিক নজরদারি সূচকে পূর্বের সংক্রমণ ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার করেছে, নিষেধাজ্ঞা চূড়ান্ত নয়। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট দেশের রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতির ভিত্তিতে তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও রাখা হয়েছে—তাপপ্রক্রিয়াজাত বা হিট-প্রসেসড মুরগির মাংস ও সংশ্লিষ্ট পণ্য নির্ধারিত স্বাস্থ্যমান পূরণ করলে আমদানি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বাস্থ্য সনদ বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, কাঁচা পণ্যে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের জন্য সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একটি বার্তা বহন করে। পোলট্রি খাতে রোগনিয়ন্ত্রণ, বায়োসিকিউরিটি এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। খামার পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি, টিকাদান কর্মসূচির স্বচ্ছতা এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে পারলে ভবিষ্যতে এমন নিষেধাজ্ঞা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে হিট-প্রসেসড পোলট্রি পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের বিকল্প পথও তৈরি হবে।
সৌদি আরবের এই পদক্ষেপ শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক পোলট্রি বাণিজ্যের জন্যও সতর্ক সংকেত। খাদ্য নিরাপত্তা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জন এখন কেবল উৎপাদন সক্ষমতার বিষয় নয়, বরং রোগনিয়ন্ত্রণ ও মান নিশ্চয়তার প্রতিযোগিতা। সেই বাস্তবতায়, নিষেধাজ্ঞাকে সংকট নয়, বরং খাত উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখাই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

