বাংলার মধ্যযুগীয় ইসলামি স্থাপত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নিদর্শনগুলোর একটি ষাটগম্বুজ মসজিদ। বাগেরহাট জেলার এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এক বিস্তৃত সভ্যতা ও নগরায়ণের সাক্ষ্য বহন করে। পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা খলিফাতাবাদ নগরীর কেন্দ্রীয় স্থাপনা হিসেবে ষাটগম্বুজ মসজিদ আজও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনিন্দ্য মেলবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাস ও স্থাপত্যের প্রেক্ষাপট
ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মিত হয় ১৪৪২ থেকে ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। নির্মাতা খান জাহান আলী ছিলেন তৎকালীন বাংলার একজন সুফি সাধক ও প্রশাসক। ইটনির্ভর এই মসজিদে মোট ৬০টির বেশি গম্বুজ রয়েছে; ভেতরে আছে ৭ সারিতে বিন্যস্ত ৬০টি পাথরের স্তম্ভ, যা পুরো ছাদকে ধারণ করেছে।
দেয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু এবং বহির্ভাগে পোড়ামাটির অলংকরণ দেখা যায়। মসজিদটি একই সঙ্গে নামাজ আদায়, দরবার এবং প্রশাসনিক সমাবেশের জন্য ব্যবহৃত হতো—যা এর বিশাল আয়তন ও নকশায় স্পষ্ট।
ষাটগম্বুজ মসজিদ এ কী দেখবেন?
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে স্তম্ভের সারিবদ্ধ বিন্যাস ও গম্বুজের পুনরাবৃত্ত ছন্দ। মিহরাবগুলোতে সূক্ষ্ম টেরাকোটা অলংকরণ রয়েছে। বাইরের দেয়ালের কারুকাজ ও কোণায় কোণায় নির্মিত টাওয়ার মধ্যযুগীয় সামরিক ও ধর্মীয় স্থাপত্যের মেলবন্ধনকে তুলে ধরে।
মসজিদ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পুরো কাঠামোর জ্যামিতিক ভারসাম্য ও স্থাপত্যিক দৃঢ়তা অনুভব করা যায়। আশপাশে খলিফাতাবাদের অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের ধ্বংসাবশেষও চোখে পড়ে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ নগর সভ্যতার ইঙ্গিত দেয়।
ষাটগম্বুজ মসজিদ কেন যাবেন?
ষাটগম্বুজ মসজিদ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার অংশ। ইতিহাস, ধর্ম ও স্থাপত্য—এই তিনের সমন্বয়ে এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র।
এখানে এসে শুধু একটি মসজিদ দেখা নয়, বরং বাংলার ইসলামি ইতিহাসের উত্থানপর্বকে অনুধাবন করা যায়। গবেষক, শিক্ষার্থী, স্থাপত্যবিদ ও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ষাটগম্বুজ মসজিদ কিভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে বাগেরহাট যাওয়ার জন্য গাবতলী বা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বাস পাওয়া যায়। খুলনা হয়ে বাগেরহাট যাওয়াও একটি প্রচলিত পথ।
বাগেরহাট জেলা সদর থেকে রিকশা, ভ্যান বা অটোরিকশায় সহজেই ষাটগম্বুজ মসজিদে পৌঁছানো যায়। ব্যক্তিগত গাড়িতে ঢাকা–খুলনা মহাসড়ক ধরে খুলনা হয়ে বাগেরহাটে যাওয়া সুবিধাজনক।
ষাটগম্বুজ মসজিদ বেড়াতে গিয়ে কোথায় খাবেন?
ষাটগম্বুজ মসজিদের আশপাশে বড় রেস্টুরেন্ট নেই। খাবারের জন্য বাগেরহাট জেলা সদর বা খুলনা শহর নির্ভরযোগ্য।
বাগেরহাটে স্থানীয় হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ, মাংস ও সাধারণ বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। খুলনায় গেলে খাবারের বিকল্প আরও বেশি।
ষাটগম্বুজ মসজিদ বেড়াতে গিয়ে কোথায় থাকবেন?
রাতযাপনের জন্য বাগেরহাট সদর এলাকায় কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। উন্নত মানের থাকার প্রয়োজন হলে খুলনা শহরে অবস্থান করা সুবিধাজনক।
অধিকাংশ দর্শনার্থী এক বা দুই দিনের সফরে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখেন।
মসজিদ পরিদর্শনের সময় শালীন পোশাক পরা ও নামাজের সময় নিরবতা বজায় রাখা জরুরি। গ্রীষ্মকালে তাপ বেশি থাকে, তাই সকাল বা বিকেলের সময় ভ্রমণ উপযোগী। বর্ষায় আশপাশে জলাবদ্ধতা হতে পারে, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

