পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত লাল ইটের এক নান্দনিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের জানান দেয়। এটির নাম হলো নর্থব্রুক হল, যা স্থানীয়দের কাছে ‘লালকুঠি’ নামে সমধিক পরিচিত।
১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে এই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। মোগল ও ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যরীতির মিশেলে তৈরি এই ভবনটি দেড়শ বছর ধরে ঢাকার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক স্থাপনার আদি সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে এবং এর সামনের পরবর্তী সময়ে নির্মিত নাট্যমঞ্চ বা মঞ্চ ভেঙে দিয়ে একটি আধুনিক জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
নর্থব্রুক হলের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে পরিগণিত দর্শর্নার্থীদের কাছে। এর উত্তর দিকে রয়েছে প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদী।
ভবনের উপরিভাগে মোগল স্থাপত্যের আদলে চারটি মিনার বা বুরুজ এবং অর্ধবৃত্তাকার খিলান একে আলাদা আভিজাত্য দান করেছে। এই হলের ভেতরে এক সময় সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি ও ক্লাব ছিল, যা ঢাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
বর্তমানে এই স্থাপনাটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এর চারপাশের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং আধুনিক সময়ে নির্মিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপনাগুলো সরিয়ে ফেলার কাজ চলছে।
মূল ভবনকে কেন্দ্র করে এখানে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বুড়িগঙ্গা তীরের ইতিহাস এবং ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে।
কিভাবে যাবেন?
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনাকে প্রথমে আসতে হবে পুরান ঢাকার সদরঘাটে। বাসে করে ভিক্টোরিয়া পার্ক বা সদরঘাট টার্মিনালে নামা যায়।
পরে ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে রিকশা নিয়ে খুব সহজেই ফরাশগঞ্জে অবস্থিত নর্থব্রুক হলে পৌঁছানো যায়। এছাড়া সদরঘাট থেকে পায়ে হেঁটে নদীর পাড় ঘেঁষে ৫-১০ মিনিট হাঁটলেও এই লাল রঙের ভবনটি চোখে পড়বে।
যা দেখবেন?
নর্থব্রুক হলে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে এর গাঢ় লাল রঙের কারুকাজ খচিত দেয়াল। ভবনের চূড়ায় থাকা মোগল শৈলীর মিনার এবং বড় বড় খিলানগুলো আপনাকে মুগ্ধ করবে।
ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া হলের ভেতরের বিশাল হলরুম এবং আদি কাঠের কাজ ইতিহাসের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। পাশেই অবস্থিত জনসন হল (যা বর্তমানে লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত) এবং ফরাশগঞ্জ এলাকার অন্যান্য প্রাচীন বাড়িগুলোও আপনি ঘুরে দেখতে পারেন।
কোথায় খাবেন?
পুরান ঢাকা মানেই ভোজনরসিকদের স্বর্গ। নর্থব্রুক হলের খুব কাছেই রয়েছে বিখ্যাত সব খাবারের দোকান। শাঁখারীবাজার বা সদরঘাট এলাকায় গিয়ে আপনি ‘বিউটি লাচ্ছি’ ও ফালুদার স্বাদ নিতে পারেন।
এছাড়া লক্ষ্মীবাজারের ‘নান্নার বিরিয়ানি’, সূত্রাপুরের ‘বিসমিল্লাহ কাবাব’ অথবা পাটুয়াটুলীর ‘ঝুনুর মোরগ পোলাও’ ট্রাই করতে পারেন। এছাড়া সদরঘাটের আশেপাশেই অসংখ্য ছোট-বড় হোটেল রয়েছে যেখানে সুলভ মূল্যে দুপুরের খাবার পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন?
আপনি যদি ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তবে থাকার জন্য সদরঘাট ও মতিঝিল এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। সদরঘাটে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে ‘হোটেল প্যাসিফিক’ বা ‘হোটেল মডার্ন’-এ থাকতে পারেন।
এছাড়া উন্নত মানের আবাসন চাইলে মতিঝিল বা গুলিস্তান এলাকায় অবস্থিত বাণিজ্যিক হোটেলগুলোতে রুম বুক করতে পারেন। নর্থব্রুক হলের এই সংস্কার ও জাদুঘর নির্মাণের উদ্যোগ সফল হলে তা ঢাকার পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শেকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

