বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে এক সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ মোগল স্থাপত্য। নাম জিঞ্জিরা প্রাসাদ। ইতিহাসে এটি ‘কারাগার প্রাসাদ’ নামেও পরিচিত।
সময়ের প্রবাহে প্রাসাদের অনেক অংশ বিলীন হয়ে গেলেও অবশিষ্ট স্থাপত্য এখনো ঢাকার মোগল আমলের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র ও বাংলার সুবেদার শাহজাদা আজম ১৬৮৯ সালের দিকে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
সে সময় বুড়িগঙ্গা নদীর দক্ষিণ তীরে নির্মিত এই স্থাপনাটি ছিল সুবিশাল এক প্রাসাদ কমপ্লেক্স। মূল প্রাসাদের পাশাপাশি ছিল দালান, উদ্যান, জলাধার এবং বিভিন্ন কক্ষ।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এটি ছিল মূলত মোগল প্রশাসনের আবাসিক ও অবকাশযাপনের স্থান। তবে জিঞ্জিরা প্রাসাদ সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে।
১৭শ শতকের শেষ দিকে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হলে বাংলার নবাব আজিম উস শানের পরিবারকে এই প্রাসাদে বন্দি করে রাখা হয়। সেই থেকেই এটি ‘কারাগার প্রাসাদ’ নামে পরিচিতি পায়। ইতিহাসের সেই ঘটনাই প্রাসাদটিকে আলাদা গুরুত্ব এনে দিয়েছে।
স্থাপত্যের দিক থেকে জিঞ্জিরা প্রাসাদে মোগল স্থাপত্যশৈলীর স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়। লাল ইটের তৈরি দেয়াল, খিলান আকৃতির দরজা, প্রশস্ত আঙিনা এবং নকশা করা কক্ষগুলো ছিল মোগল নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য।
প্রাসাদের চারপাশে ছিল উঁচু প্রাচীর, যা একে সুরক্ষিত করে রাখত। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাসাদে একসময় প্রায় শতাধিক কক্ষ ছিল।
কালের আবর্তে প্রাসাদের বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে মাত্র কয়েকটি দেয়াল ও ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা বসতি এবং অবহেলার কারণে প্রাসাদের অনেক অংশ বিলীন হয়ে গেছে।
তবুও অবশিষ্ট অংশগুলো দেখলেই মোগল আমলের স্থাপত্যরীতি ও ইতিহাসের একটি ধারণা পাওয়া যায়।ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে জিঞ্জিরা প্রাসাদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি শুধু একটি পুরোনো প্রাসাদ নয়; বরং মোগল শাসনামলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
যা দেখবেন
জিঞ্জিরা প্রাসাদে গেলে দেখতে পাবেন প্রাসাদের অবশিষ্ট দেয়াল, খিলান আকৃতির দরজা এবং মোগল স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। পুরোনো ইটের গাঁথুনি এবং স্থাপত্যের ধরণ থেকে সহজেই বোঝা যায় এটি একসময় কতটা বিশাল ছিল।
পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী পরিবেশও ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে প্রথমে সদরঘাট বা গুলিস্তান এলাকায় যেতে হবে। সেখান থেকে সড়কপথে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা এলাকায় পৌঁছানো যায়।
রিকশা বা স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করে প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব। অনেকেই সদরঘাট থেকে নৌকায় করে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে জিঞ্জিরা এলাকায় যান।
কোথায় খাবেন
জিঞ্জিরা এলাকার আশপাশে ছোটখাটো খাবারের দোকান ও স্থানীয় রেস্টুরেন্ট রয়েছে। তবে ভালো খাবারের জন্য অনেকেই সদরঘাট, চকবাজার বা পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার এলাকায় যান। সেখানে কাচ্চি বিরিয়ানি, কাবাব, নেহারি ও ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
জিঞ্জিরা এলাকায় পর্যটকদের জন্য বড় কোনো হোটেল নেই। তবে কাছাকাছি গুলিস্তান, মতিঝিল বা পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। উন্নত মানের হোটেলের জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকাগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে।
মোগল আমলের স্থাপত্য ও ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে জিঞ্জিরা প্রাসাদ। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

