রাজধানীর ব্যস্ত এলিফ্যান্ট রোডের কোলাহলের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি হলো জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর।
এটি মূলত শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নিজ বাসভবন, যেখানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগ্রাম, লেখালেখি ও আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে তাঁর ছোট ছেলে সাইফ ইমাম জামি ২০০৭ সালে এই বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপ দেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জাহানারা ইমামের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বড় ছেলে শাফি ইমাম রুমি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন।
সেই বেদনাময় স্মৃতি, যুদ্ধের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং একজন মায়ের সংগ্রাম তিনি লিখে গেছেন বিখ্যাত ডায়েরি গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি-তে। এই বাড়ির দেয়াল, কক্ষ আর সিঁড়িগুলো যেন সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
জাদুঘরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে জাহানারা ইমামের ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, বই, নথি ও আলোকচিত্র। এখানে সংরক্ষিত আছে তাঁর লেখালেখির টেবিল, ব্যবহৃত চশমা, বইপত্র, পারিবারিক ছবি এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা দলিল।
দর্শনার্থীরা দেখতে পান শহীদ রুমির ছবি ও তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্মৃতিচিহ্নও। এসব উপকরণ শুধু একটি পরিবারের ইতিহাসই নয়, বরং পুরো জাতির মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে তুলে ধরে।
জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষে সাজানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনের নানা দলিল। ১৯৯০-এর দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন জাহানারা ইমাম।
সেই সময়কার পোস্টার, সংবাদপত্রের কাটিং এবং আন্দোলনের বিভিন্ন স্মারক এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে জাদুঘরটি শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, স্বাধীনতার পরবর্তী ন্যায়বিচারের আন্দোলনেরও দলিল হয়ে উঠেছে।
নীরব পরিবেশে ঘুরে ঘুরে এসব স্মৃতি দেখলে দর্শনার্থীরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন একজন মায়ের ব্যক্তিগত শোক কীভাবে জাতির সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে তাই এই জাদুঘর বিশেষ আগ্রহের জায়গা।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে বাস বা রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে করে সহজেই এলিফ্যান্ট রোডে পৌঁছানো যায়। শাহবাগ, নিউমার্কেট বা ধানমন্ডি এলাকা থেকে রিকশা কিংবা সিএনজি অটোরিকশায় কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এলিফ্যান্ট রোডের ভেতরে অবস্থিত জাহানারা ইমামের বাড়িতেই জাদুঘরটি।
যা দেখবেন
জাদুঘরে সংরক্ষিত জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী, মুক্তিযুদ্ধকালীন দলিল, শহীদ রুমির স্মৃতিচিহ্ন, পারিবারিক আলোকচিত্র এবং যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনের নথিপত্র দেখতে পারবেন। পাশাপাশি তাঁর লেখা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন বইয়ের সংগ্রহও রয়েছে।
কোথায় খাবেন
এলিফ্যান্ট রোড ও নিউমার্কেট এলাকাজুড়ে রয়েছে নানা ধরনের খাবারের রেস্টুরেন্ট। আশপাশে দেশি খাবারের হোটেল, ফাস্টফুড দোকান ও ক্যাফে সহজেই পাওয়া যায়। ধানমন্ডি ও শাহবাগ এলাকাতেও বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
কোথায় থাকবেন
দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য ধানমন্ডি, শাহবাগ ও কারওয়ান বাজার এলাকায় বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে স্বল্প খরচ থেকে শুরু করে উন্নত মানের থাকার ব্যবস্থাও পাওয়া যায়। এলিফ্যান্ট রোডের অবস্থান শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় যেকোনো জায়গা থেকেই সহজে যাতায়াত করা যায়।

