ঢাকার কোলাহল থেকে অদূরে তুরাগ নদীর তীরবর্তী বিরুলিয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন স্মৃতিচিহ্ন। নাম বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি।
এক সময়ের প্রভাবশালী জমিদার রজনীকান্ত ঘোষের এই বাড়ি আজ ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। নদীর শান্ত স্রোত, পুরোনো স্থাপত্যের ছাপ এবং গ্রামীণ পরিবেশের মিশেলে জায়গাটি যেন অতীতের এক নীরব গল্প বলে যায়।
বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি নির্মিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ দিকে। জমিদার রজনীকান্ত ঘোষ ছিলেন এ অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার ও সমাজসেবক।
তাঁর উদ্যোগে নির্মিত এই বাড়িটি একসময় ছিল এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও বাড়িটির স্থাপত্য ও পরিবেশ এখনো সেই অতীতের স্মৃতি ধরে রেখেছে।
জমিদার বাড়ির স্থাপত্যে রয়েছে ইউরোপীয় ও উপমহাদেশীয় নির্মাণশৈলীর মিশ্র প্রভাব। লাল ইটের দেয়াল, খিলান আকৃতির জানালা, প্রশস্ত বারান্দা এবং অলংকৃত কারুকাজ এই বাড়িকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
বাড়ির ভেতরে রয়েছে বড় আকারের উঠান, পুরোনো কক্ষ এবং দীর্ঘ করিডর, যা এক সময় জমিদার পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সাক্ষী ছিল। বর্তমানে বাড়িটির কিছু অংশ ভগ্নপ্রায় হলেও স্থাপত্যের সৌন্দর্য এখনো স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
তুরাগ নদীর তীরবর্তী অবস্থান এই জমিদার বাড়ির অন্যতম বিশেষত্ব। নদীর বাতাস আর গ্রামীণ পরিবেশ জায়গাটিকে করে তুলেছে শান্ত ও প্রশান্ত। বিকেলের সময় নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা ভ্রমণকারীদের কাছে আলাদা অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
নদীপাড়ে স্থানীয় জেলেদের নৌকা, গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন আর পুরোনো বাড়ির পটভূমি মিলিয়ে এখানে এক ধরনের ঐতিহাসিক আবহ তৈরি হয়।
বর্তমানে বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি স্থানীয়দের কাছে একটি পরিচিত ঐতিহাসিক নিদর্শন হলেও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এটি এখনো তেমনভাবে বিকশিত হয়নি। তবু ইতিহাস ও স্থাপত্যের প্রতি আগ্রহী মানুষদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার মিরপুর বা গাবতলী এলাকা থেকে সহজেই বিরুলিয়া যাওয়া যায়। গাবতলী থেকে সিএনজি অটোরিকশা বা স্থানীয় পরিবহনে তুরাগ নদীর পাশের বিরুলিয়া গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব।
এছাড়া মিরপুর থেকে সড়কপথে বা নৌকায় নদী পার হয়ে বিরুলিয়ায় যাওয়া যায়। ব্যক্তিগত গাড়িতে গেলে আমিনবাজার হয়ে বিরুলিয়া রোড ধরে সহজেই জমিদার বাড়িতে পৌঁছানো যায়।
যা দেখবেন
বিরুলিয়া জমিদার বাড়ির মূল ভবনের স্থাপত্যই এখানে দেখার প্রধান আকর্ষণ। লাল ইটের প্রাচীন দেয়াল, খিলানযুক্ত বারান্দা ও পুরোনো করিডর এখনো সেই জমিদারি আমলের স্মৃতি বহন করে।
বাড়ির আশপাশের পরিবেশও বেশ আকর্ষণীয়। তুরাগ নদীর তীর, গ্রামের শান্ত পরিবেশ এবং পুরোনো স্থাপত্য মিলিয়ে এখানে একটি আলাদা ঐতিহাসিক আবহ অনুভব করা যায়।
কোথায় খাবেন
বিরুলিয়া এলাকায় বড় ধরনের রেস্তোরাঁ না থাকলেও স্থানীয় ছোট খাবারের দোকানে দেশি খাবার পাওয়া যায়। তবে ভালো খাবারের জন্য গাবতলী বা মিরপুর এলাকায় ফিরে আসাই সুবিধাজনক।
সেখানে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ভাত, মাছ, মাংসসহ নানা ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
কোথায় থাকবেন
বিরুলিয়া গ্রামে পর্যটকদের জন্য থাকার আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই যারা দূর থেকে আসবেন তারা ঢাকার মিরপুর, গাবতলী বা উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন হোটেল ও গেস্টহাউসে থাকতে পারেন।
এসব জায়গা থেকে বিরুলিয়ায় যাতায়াতও সহজ।
তুরাগ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং এটি ঢাকার প্রান্তিক অঞ্চলের এক টুকরো ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও এই বাড়ির দেয়ালগুলো এখনো অতীতের গল্প বলে যায়।

