পুরান ঢাকার অলিগলি জুড়ে ছড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর স্থাপত্যের নানা নিদর্শন। সেই ঐতিহ্যের ভেতর অন্যতম নান্দনিক নিদর্শন হলো তারা মসজিদ।
নকশার অভিনবত্ব, দেয়ালজুড়ে তারার মোটিফ এবং মোগল স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে বিশেষভাবে পরিচিত।
১৮ শতকে ঢাকার জমিদার মীর্জা গোলাম পীর এই মসজিদ নির্মাণ করেন। পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকার আবুল খায়রাত সড়কে অবস্থিত এই মসজিদটি কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে মসজিদটি আরও নান্দনিক রূপ পেয়েছে, তবে তার মূল ঐতিহ্য এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
তারা মসজিদের স্থাপত্যে মোগল ধাঁচের প্রভাব স্পষ্ট। আয়তনে তুলনামূলক ছোট হলেও এর নকশা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মসজিদের মূল অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১২ ফুট।
দেয়াল, খিলান ও গম্বুজের বিভিন্ন অংশে নীলাভ সাদা সিরামিক টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে, যার ওপর অসংখ্য তারার নকশা তৈরি করা হয়েছে। এই তারার মোটিফ থেকেই মসজিদটির নাম হয়েছে ‘তারা মসজিদ’।
সূক্ষ্ম কারুকাজ, জ্যামিতিক অলংকরণ এবং গম্বুজের গঠন মসজিদটিকে এক অনন্য নান্দনিকতা দিয়েছে। মসজিদের ভেতরের অংশেও রয়েছে দৃষ্টিনন্দন অলংকরণ।
দেয়ালজুড়ে সজ্জিত টাইলসের নকশা ও খিলানের কারুকাজ দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। দিনের আলো যখন জানালা দিয়ে ভেতরে পড়ে, তখন টাইলসের নকশাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফলে এটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, স্থাপত্যপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
কিভাবে যাবেন
তারা মসজিদে যেতে হলে ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে পুরান ঢাকার দিকে আসতে হবে। সদরঘাট, গুলিস্তান বা চাঁনখারপুল পর্যন্ত বাস বা রাইড শেয়ারিং সেবায় আসা যায়।
সেখান থেকে রিকশা বা হেঁটে আরমানিটোলার আবুল খায়রাত সড়কে পৌঁছানো যায়। পুরান ঢাকার সরু রাস্তা আর ঐতিহ্যবাহী পরিবেশের মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে সহজেই চোখে পড়বে ঐতিহাসিক এই মসজিদ।
যা দেখবেন
তারা মসজিদে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে দেয়ালজুড়ে অসংখ্য তারার নকশা। গম্বুজের গঠন, খিলানের অলংকরণ এবং টাইলসের সূক্ষ্ম কারুকাজ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
পাশাপাশি পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক পরিবেশ, আশপাশের পুরনো স্থাপনা এবং সরু অলিগলির জীবনচিত্রও ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে।
কোথায় খাবেন
পুরান ঢাকা মানেই ঐতিহ্যবাহী খাবারের ভাণ্ডার। তারা মসজিদ থেকে খুব দূরে নয় এমন এলাকায় পাওয়া যায় বিখ্যাত কাচ্চি বিরিয়ানি, নেহারি, কাবাব এবং নানা ধরনের পুরান ঢাকার মিষ্টান্ন।
বিশেষ করে হাজীর বিরিয়ানি এবং নান্না মিয়ার বিরিয়ানি পুরান ঢাকার জনপ্রিয় খাবারের জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
কোথায় থাকবেন
ঢাকায় ভ্রমণে এলে থাকার জন্য কাছাকাছি এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক থাকার জন্য হোটেল ৭১ বা এফএআরএস রিসোর্ট বেছে নিতে পারেন।
এখান থেকে অল্প সময়েই পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে যাওয়া সম্ভব।
শত বছরের ঐতিহ্য, অনন্য কারুকাজ এবং মোগল স্থাপত্যের সৌন্দর্য সব মিলিয়ে তারা মসজিদকে ঢাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল স্মারকে পরিণত করেছে। পুরান ঢাকার কোলাহলের মাঝেও এই মসজিদ যেন অতীতের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

