বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে অনিরাপদ এবং বিষাক্ত খাবার গ্রহণের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একটি নতুন ও যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, অনিরাপদ খাবার প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি মানুষকে অসুস্থ করছে এবং কেড়ে নিচ্ছে ১৫ লাখ মানুষের প্রাণ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার (সুপারবাগ) মারাত্মক মিশ্রণে খাদ্য দূষণ এখন এক নীরব বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
সংখ্যার উপাত্ত
- ৮৮ কোটি ৬০ লাখ: প্রতি বছর দূষিত খাবার খেয়ে যত মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন (বিশ্বের প্রতি ৯ জনের মধ্যে ১ জন)।
- ১৫ লাখ: অনিরাপদ খাদ্যের কারণে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা। এর মধ্যে সীসা ও আর্সেনিক বিষক্রিয়ার মতো রাসায়নিক দূষণের কারণে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
- ৩ গুণ: প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি।
- ৭৫%: বিশ্বের মোট খাদ্যবাহিত অসুস্থতার তিন-চতুর্থাংশই ঘটছে মাত্র দুটি অঞ্চলে: আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
মূল সমস্যা যেখানে
খাদ্য নিরাপত্তা এখন আর কেবল সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং এটি অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের সাথে সরাসরি জড়িয়ে গেছে।
- জলবায়ুর প্রভাব: বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আমাদের খাদ্য সরবরাহে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং পরজীবীর বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার মারাত্মকভাবে ত্বরান্বিত হচ্ছে।
- ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু: অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বৃদ্ধির কারণে সাধারণ ফুড পয়জনিং-এর জীবাণুগুলোও এখন প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ধ্বংস করা যাচ্ছে না, ফলে সাধারণ ইনফেকশনও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
আঞ্চলিক বৈষম্য
- বিশ্বব্যাপী সামগ্রিকভাবে খাদ্যবাহিত রোগ পূর্বের তুলনায় কিছুটা কমলেও অঞ্চলভেদে চরম বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে গেছে।
- পুরো পৃথিবীর মধ্যে কেবল আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেই মোট খাদ্যজনিত অসুস্থতার তিন-চতুর্থাংশ এবং মৃত্যুর ৬০ শতাংশ ঘটে থাকে।
খাবারের ভেতরের বিষ
- ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৮৬ কোটি মানুষ ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের মতো জৈবিক উপাদানের কারণে সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।
- তবে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে রাসায়নিক উপাদানগুলো অনেক বেশি দায়ী, যার মধ্যে আর্সেনিক ও সিসার বিষক্রিয়া অন্যতম প্রধান কারণ।
আর্থিক ক্ষতি
- এই শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ছাড়াও খাদ্যবাহিত রোগের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বিশাল বড় ধাক্কা লাগছে।
- ২০২১ সালে মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা নষ্ট হওয়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৬৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
শেষ কথা
“খাদ্য নিরাপত্তা কোনো তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত বিষয় নয়—এটি প্রতিটি মানুষের প্রতিদিনের প্রতি বেলার খাবারের সাথে জড়িয়ে আছে।”
— ডা. তেদরোস আধানোম গেব্রেউসাস, মহাপরিচালক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
নতুন এই উপাত্ত প্রমাণ করে যে, উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের বর্তমান খাদ্য পরিদর্শন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে। তাই এখন বিশ্বজুড়ে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ চেইনে জরুরি এবং পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

