ব্যাপারটা আসলে এমন দাঁড়িয়েছে যে, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুম এলে মুদি দোকানে সেভেন আপের বোতলগুলো যেন এক একটা নীরব অস্ত্রে পরিণত হয়।
আপনি হয়তো প্রচণ্ড গরমে গলা ভেজাতে দোকানে গিয়ে একটি সেভেন আপ চাইলেন, আর পাশে দাঁড়ানো বন্ধুটি মুচকি হেসে বলল, কিরে, তুই তো ওই দল করিস না, তুই খাচ্ছিস কেন! এই যে নিরীহ একটি লেমন ড্রিংকসকে ঘিরে এমন অদ্ভুত রসিকতা, এর শেকড় লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষের ফুটবল উন্মাদনার একেবারে গভীরে। এখানে সেভেন আপ কেবল একটি পানীয় নয়, এটি একটি দলের সমর্থকদের বুক ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত হাতিয়ার। চলুন একটু ভেঙে বলা যাক কীভাবে এই ‘সেভেন আপ খাওয়া দল’ তকমাটি আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল।
সেই অভিশপ্ত রাত
ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০১৪ সালের ৮ জুলাই। ব্রাজিলের বেলো হরিজন্তে স্টেডিয়াম। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, গ্যালারিতে হলুদ-সবুজ সাগরের উচ্ছ্বাস। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ জার্মানি। নেইমারবিহীন ব্রাজিল দলে এমনিতেই একটু শঙ্কার মেঘ ছিল, কিন্তু যা ঘটল তার জন্য প্রস্তুত ছিল না খোদ ফুটবল বিধাতাও। প্রথমার্ধের মাত্র ২৯ মিনিটের মাথায় জার্মানি ৫টি গোল করে বসে। আর পুরো ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন দাঁড়ায় জার্মানি ৭, ব্রাজিল ১। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল দলটি নিজেদের মাটিতে এমনভাবে বিধ্বস্ত হবে, তা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে স্টেডিয়াম ছেড়েছিলেন ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরা। আর ঠিক সেই রাতেই জন্ম নিয়েছিল আগামী দশকের সবচেয়ে বড় ফুটবলীয় ট্রল ম্যাটেরিয়াল।
শব্দগুচ্ছের উৎপত্তি
ফুটবল বিশ্বে এই ম্যাচটিকে ‘মিনেরাজো’ বা মিনেইরাওয়ের ট্র্যাজেডি বলা হলেও, বাংলাদেশের রসিক সমর্থকেরা এর একটি সম্পূর্ণ দেশীয় নামকরণ করে ফেললেন। যেহেতু জার্মানি ৭টি গোল দিয়েছিল, তাই ৭ সংখ্যাটিকে চিরস্থায়ীভাবে ব্রাজিলের নামের পাশে বসিয়ে দেওয়ার একটি উপায় খোঁজা হচ্ছিল। আর আমাদের হাতের কাছেই থাকা জনপ্রিয় কোমল পানীয় ‘সেভেন আপ’ হয়ে উঠল সেই নিখুঁত প্রতীক।
৭ গোলের কারণে সেভেন এবং এরপর আর যেন ব্রাজিল সমর্থকদের মাথা তোলার উপায় নেই, তাই আপ। দুইয়ে মিলে সেভেন আপ। এই শব্দগুচ্ছটি এতটাই জনপ্রিয় হলো যে, রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকান- সব জায়গায় একটি দলের নতুন নামই হয়ে গেল ‘সেভেন আপ খাওয়া দল’।
চায়ের কাপে ঝড়
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া। ছাদে ছাদে পাল্লা দিয়ে পতাকা ওড়ানো, কে কত বড় পতাকা বানাতে পারে তার প্রতিযোগিতা, আর চায়ের স্টলে গলা ফাটিয়ে তর্ক করা। ২০১৪ সালের ওই ম্যাচের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেল। দশকের পর দশক ধরে ব্রাজিলের ৫টি বিশ্বকাপ শিরোপার কথা শুনে যে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কোণঠাসা হয়ে থাকতে হতো, তারা অবশেষে একটি মোক্ষম জবাব দেওয়ার সুযোগ পেল।
এরপর থেকে যখনই ব্রাজিলের খেলা আসে, কিংবা বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার আসর বসে, তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের বন্যা বয়ে যায়। কেউ হয়তো সেভেন আপের বোতলে স্ট্রাইকারের ছবি বসিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা আবার ৭ সংখ্যাটি নিয়ে নানা গাণিতিক হিসাব মেলাচ্ছেন। এই দ্বৈরথ আমাদের একঘেয়ে জীবনে কিছুটা হলেও বিনোদনের রসদ জুগিয়ে যাচ্ছে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
এখানে একটা বিষয় একটু তলিয়ে দেখা দরকার। স্পোর্টস সাইকোলজি বা ক্রীড়া মনস্তত্ত্ব নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা এই ধরনের ট্রল কালচারকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখেন। সমর্থকেরা যখন তাদের প্রিয় দলের ব্যর্থতায় হতাশ হন, তখন প্রতিপক্ষকে ছোট করার মাধ্যমে তারা এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খোঁজেন।
একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা যায় শ্যাডেনফ্রয়ড, অর্থাৎ অন্যের দুর্গতিতে আনন্দ পাওয়া। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা দীর্ঘকাল শিরোপাহীন থাকার কারণে তাদের সমর্থকদের যে অবদমিত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেভেন আপ তত্ত্বটি যেন সেই ক্ষোভেরই এক বিশাল বিস্ফোরণ। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। অনেক সময় এই ট্রলগুলো মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরার মতো ঘটনাও ঘটে। স্রেফ নির্মল বিনোদন বা খেলার আনন্দ যখন ব্যক্তিগত আক্রোশে পরিণত হয়, তখন ফুটবলের মূল সৌন্দর্যই আসলে বাধাগ্রস্ত হয়।
বাণিজ্যিক প্রহসন
আরেকটা মজার দিক হলো এর বাণিজ্যিক প্রভাব। কোনো ডেটা অ্যানালিটিক্স ছাড়াই বলা যায়, বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে সেভেন আপের বিক্রি অন্যান্য সময়ের তুলনায় কিছুটা হলেও ভিন্ন মাত্রা পায়। অন্তত ট্রল করার উদ্দেশ্যে হলেও বহু মানুষ এই পানীয়টি কেনেন। বন্ধুরা মিলে খেলা দেখার সময় যদি ব্রাজিল হারে বা খারাপ খেলে, তবে টেবিলের মাঝখানে একটি বড় সেভেন আপের বোতল এনে রাখাটা যেন এক অঘোষিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক স্থানীয় রেস্তোরাঁ বা ক্যাফে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্বকাপের সময় বিশেষ ‘সেভেন আপ কম্বো’ বা অফার ছাড়ে, যা মার্কেটিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দারুণ এক চতুর কৌশল। একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড কোনো ধরনের স্পন্সরশিপ ছাড়াই কীভাবে একটি দেশের নির্দিষ্ট সাব-কালচারে ঢুকে গিয়ে বিনামূল্যে এত বড় প্রমোশন পেয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে রীতিমতো কেস স্টাডি হতে পারে।
তবে দিনশেষে ফুটবল একটি খেলা। জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন নিয়েই এর রোমাঞ্চ। ২০১৪ সালের সেই পরাজয় ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে একটি কালো দাগ হলেও, তাদের সোনালী অতীত এবং ৫টি বিশ্বকাপের গৌরবকে মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে ট্রল বা মিম কালচারও আধুনিক ফুটবল ফ্যানডমের একটি স্বাভাবিক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ‘সেভেন আপ খাওয়া দল’ তকমাটি নিয়ে যতই বিতর্ক বা হাসি-ঠাট্টা হোক না কেন, এটি প্রমাণ করে যে এ দেশের মানুষ ফুটবলকে কতটা আবেগের সাথে ধারণ করে। মাঠের খেলা শেষ হয়ে গেলেও, চায়ের কাপের আড্ডায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে ফুটবল এভাবেই বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকে আমাদের প্রতিদিনের উদযাপনে।

