ইন্টারনেটের যুগে ফুটবল উন্মাদনা আর শুধু ৯০ মিনিটের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে ফেসবুকের নিউজফিড এবং গুগলের সার্চ বক্সে। বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার মতো বড় টুর্নামেন্ট এলেই গুগলের সার্চ ট্রেন্ডে অদ্ভুত সব পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষ শুধু প্রিয় দলের খেলার সময়সূচিই খোঁজে না, বরং প্রতিপক্ষকে নিয়ে ট্রল করতেও সার্চ ইঞ্জিনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
এমনই একটি মজার অথচ অদ্ভুত সার্চ ট্রেন্ড হলো— ‘চোরের দলের ফুটবল খেলা কবে’ বা ‘চোরের দল খেলা কবে’। আপাতদৃষ্টিতে কিওয়ার্ডগুলো দেখে অবাক লাগলেও, এর পেছনের গল্পটা পুরোপুরি ফুটবল-ভক্তদের নিখাদ পাগলামি আর রেষারেষির। চলুন, পুরো বিষয়টা একটু গভীরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।
ফুটবলে ‘চোরের দল’ আসলে কারা?
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, ফিফা বা বিশ্ব ফুটবলে ‘চোরের দল’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দলের অস্তিত্ব নেই। এটি মূলত একটি ট্রল বা ব্যঙ্গাত্মক শব্দগুচ্ছ, যা ফুটবল ফ্যানরা তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করে থাকে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে এই রেষারেষি সবচেয়ে বেশি। যখন কোনো দল রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে গোল পায় বা পেনাল্টি জিতে নেয়, তখন বিপক্ষ দলের সমর্থকরা তাদের ‘চোর’ আখ্যা দেয়।
অর্থাৎ, আপনি যদি আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হন, তবে হয়তো মজার ছলে ব্রাজিলকে এই নামে ডাকছেন। আবার উল্টোটিও সত্যি। তাই গুগলে যখন কেউ ‘ফুটবল চোরের দলের খেলা কবে’ লিখে সার্চ করেন, তখন তিনি মূলত তার সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের খেলার শিডিউলটিই খুঁজছেন, যাতে ম্যাচ হারলে ট্রল করার রসদ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা যায়।
যেখান থেকে শুরু: ট্রল নাকি তীব্র উন্মাদনা?
ফুটবলে এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক নামকরণের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তবে ডিজিটাল যুগে এসে এটি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে কিছু হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে রেফারির বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়। কখনো অফসাইডের ফাঁদ, কখনো বা ডি-বক্সের ভেতরে হালকা স্পর্শেই পেনাল্টি আদায় করে নেওয়া। এসব ঘটনা বিপক্ষ দলের সমর্থকদের মনে এই বিশ্বাস জন্ম দেয় যে, ম্যাচটি ‘চুরি’ করা হয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় মিম আর ট্রল। খেলা শুরুর আগে তাই প্রতিপক্ষের সমর্থকরা একে অপরকে খোঁচা দিতে সার্চ ইঞ্জিনে ‘চোরের দলের খেলা কবে ফুটবল’ লিখে খোঁজ করেন এবং সেই স্ক্রিনশট শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তাপ ছড়ান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম ও সাইবার যুদ্ধ
ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) বা ইনস্টাগ্রামের স্পোর্টস গ্রুপগুলোতে ঢুঁ মারলে এই সাইবার যুদ্ধের আসল রূপ দেখা যায়। বড় কোনো টুর্নামেন্ট চলাকালীন এই গ্রুপগুলো রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ট্রল পেজগুলো অদ্ভুত সব মিম তৈরি করে।
কোনো দলের খেলা সামনে এলেই ক্যাপশনে লেখা হয়, “চোরের দলের ফিফা খেলা কবে, কেউ কি জানেন?” এ ধরনের পোস্টগুলোতে হাজার হাজার কমেন্ট পড়ে, যেখানে যুক্তিতর্কের চেয়ে আবেগ এবং ব্যঙ্গই বেশি প্রাধান্য পায়। এই ডিজিটাল ট্রল কালচার এখন ফুটবল বিনোদনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কবে খেলবে এই ‘চোরের দল’? (অনুসন্ধানের আসল উত্তর)
গুগল সাধারণত মানুষের সার্চ ইনটেন্ট বা খোঁজার উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করে। কেউ যখন ‘চোরের দলের ফুটবল খেলা কবে’ বা ‘ফিফা চোরের দলের খেলা কবে’ লিখে সার্চ করেন, তখন সার্চ ইঞ্জিন অনেক সময়ই বিভ্রান্ত হয়। তবে অ্যালগরিদম যখন বুঝতে পারে যে এই শব্দটি নির্দিষ্ট কোনো টুর্নামেন্ট বা নির্দিষ্ট কোনো হাই-প্রোফাইল দলের (যেমন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল) ট্রল নাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সে ওই দলগুলোর আসন্ন ম্যাচের সময়সূচিই রেজাল্টে দেখায়।
ধরুন, কোপা আমেরিকা বা বিশ্বকাপের সময় যদি এমন সার্চ ভলিউম বাড়ে, তবে বুঝতে হবে শিগগিরই ল্যাটিন আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান কোনো জায়ান্ট দলের ম্যাচ রয়েছে। আসল উত্তরটা হলো, এই দলটির খেলা তখনই থাকে, যখন ফুটবল ক্যালেন্ডারে কোনো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের ম্যাচ নির্ধারিত থাকে।
ফ্যানবেসের মনস্তত্ত্ব: কেন আমরা প্রতিপক্ষকে খাটো করতে পছন্দ করি?
এই পুরো বিষয়টার পেছনে মানুষের এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, স্পোর্টস ফ্যানডম বা কোনো দলের অন্ধ সমর্থন মানুষের ‘ট্রাইবাল’ বা গোষ্ঠীগত প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলে। নিজের দলকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের চেয়ে অনেক সময় প্রতিপক্ষকে ছোট করাতেই ফ্যানরা বেশি আনন্দ পায়। একে বলা হয় ‘স্পোর্টিং শ্যাডেনফ্রয়েড’ (Sporting Schadenfreude)—অর্থাৎ অন্যের ব্যর্থতায় আনন্দ পাওয়া।
প্রতিপক্ষ দল যখন রেফারিংয়ের ভুলে জেতে, তখন নিজেদের হতাশা ঢাকতে ফ্যানরা তাদের ‘চোরের দল’ আখ্যা দিয়ে একধরনের মানসিক প্রশান্তি লাভ করে। এই সাইকোলজিক্যাল ডিফেন্স মেকানিজম থেকেই অদ্ভুত সব কিওয়ার্ডের জন্ম হয়।
ফিফা ও রেফারিং বিতর্ক: যেখান থেকে এমন তকমার জন্ম
ফুটবলে ‘চুরি’ শব্দটির সবচেয়ে আইকনিক উদাহরণ সম্ভবত ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। তবে আধুনিক ফুটবলে ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি আসার পরও বিতর্কের অবসান হয়নি। মিলিমিটারের ব্যবধানে অফসাইড বাতিল হওয়া কিংবা হ্যান্ডবলের বিতর্কিত নিয়মের কারণে প্রায়ই ম্যাচ রেফারিদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। অনেক ফ্যানের বদ্ধমূল ধারণা থাকে যে, ফিফা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মেগাস্টারের দলকে বেশি সুবিধা দেয়। এই কনস্পিরেসি থিওরিগুলোই ট্রল পেজগুলোর প্রধান রসদ। আর তাই ফিফা বিশ্বকাপের সময় ‘চোরের দলের খেলা কবে ফিফা’—এ জাতীয় সার্চের পরিমাণ কল্পনাতীত হারে বেড়ে যায়।
দিনশেষে ফুটবলটাই জয়ী
গুগলের সার্চ বক্সে অদ্ভুত সব কিওয়ার্ড টাইপ করা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করা—এসব কিছু আসলে ফুটবলের প্রতি মানুষের তীব্র আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ। ‘চোর দলের খেলা কবে’ লিখে সার্চ করা মানুষটিও কিন্তু ওই দিন টিভির সামনে থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাবেন না। কারণ, দিনশেষে আমরা সবাই সুন্দর ফুটবলের ভক্ত। এই রেষারেষি, ট্রল, মিম—এগুলো ফুটবলের সৌন্দর্যকে নষ্ট করে না, বরং উত্তাপ ও উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রতিপক্ষকে যতই ‘চোর’ বা অন্য কোনো বিশেষণে ডাকা হোক না কেন, রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের ফুটবলটাই আসল বিজয়ী হয়ে ওঠে। আর ফ্যানরা অপেক্ষায় থাকেন পরবর্তী ম্যাচের, নতুন কোনো ট্রল আর নতুন কোনো উন্মাদনার খোঁজে।

